ব্রেকিং
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সবুজায়নের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসৌদি আরবের ইসরায়েল স্বীকৃতির সম্ভাবনা বাড়ার দাবি ট্রাম্পের, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণনিউইয়র্কে ২৪ অক্টোবর থেকে আগাম ভোট, ৩ নভেম্বর নির্ধারিত হবে নির্বাচনের ভাগ্যসাভারে সেনাবাহিনীর সাত ইউনিটকে জাতীয় পতাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমাননিউইয়র্কের গভর্নর নির্বাচন ঘিরে হোকুল-ব্লেকম্যানের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, ভোটের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ

মাদকের বিরুদ্ধে মাঠে নামলেই বিতর্ক, অথচ নীরবতায় বাড়ছে সংকট: ইশরাকের উদ্যোগ প্রশংসনীয়

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার আজ আর কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি দেশের তরুণ প্রজন্ম, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ। এমন বাস্তবতায় মাদকের বিরুদ্ধে সরাসরি মাঠে নেমে আলোচনায় এসেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় তাঁর মাদকবিরোধী অভিযান এবং অস্ত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে সমালোচনা-আলোচনা চললেও, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে জনপ্রতিনিধিরা কি শুধু বিবৃতি দেবেন, নাকি মাঠপর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন? অস্ত্র প্রদর্শনের আইনগত দিক অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি; কিন্তু সেই বিতর্কের আড়ালে মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়। কারণ, মাদক নির্মূলে শুধু প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং সামাজিক প্রতিরোধের সম্মিলিত উদ্যোগ। এই বাস্তবতায় ইশরাক হোসেনের পদক্ষেপকে ঘিরে বিতর্কের পাশাপাশি মাদকবিরোধী লড়াইকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসা উচিত।

মাদকের বিরুদ্ধে মাঠে নামলেই বিতর্ক, অথচ নীরবতায় বাড়ছে সংকট: ইশরাকের উদ্যোগ প্রশংসনীয়
মাদকের বিরুদ্ধে মাঠে নামলেই বিতর্ক, অথচ নীরবতায় বাড়ছে সংকট: ইশরাকের উদ্যোগ প্রশংসনীয়

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ায়। মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর এই পদক্ষেপকে ঘিরে একদিকে উঠেছে আইনসঙ্গততা ও অস্ত্র প্রদর্শনের প্রশ্ন, অন্যদিকে মাদকবিরোধী প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রশ্নটি তাই শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র থাকা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আরও বড়—মাদকের বিস্তার যখন পরিবার, সমাজ ও তরুণদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করছে, তখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কি কেবল বিবৃতি দেবেন, নাকি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন?

মাদকবিরোধী অবস্থানকে কেন ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে?

১৭ অক্টোবর ২০২৬ রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার একটি এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, সাধারণ নাগরিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি সেখানে যান। অভিযানের সময় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়ায় আত্মরক্ষার্থে তিনি ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, তাঁর ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং অভিযানে আটক ছয়জনকে জব্দ করা আলামতসহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব তথ্য তাঁর পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি; অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা ও ঘটনার পূর্ণ পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত।

তবে মাদকবিরোধী উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই—জনপ্রতিনিধিরা যদি নিজ নিজ এলাকার মাদক পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি খোঁজ নেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কথা শোনেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চান এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হন, তাহলে মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হতে পারে।

একজন জনপ্রতিনিধির কাজ কেবল সংসদে বক্তব্য দেওয়া বা নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যাওয়া নয়। এলাকার মানুষের নিরাপত্তা, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং নাগরিকদের জীবনমান রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখাও তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ।

মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করলেই কি চলবে?

মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু মাদক একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের প্রবাহ, স্থানীয় অপরাধী চক্র, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ।

এই সমস্যার সমাধান শুধু কয়েকটি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান, অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রতিরোধ কর্মসূচি।

গেণ্ডারিয়ার ঘটনায় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবরও সেখানে বড় পরিসরে অভিযান চালানো হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি জানান, ১৭ অক্টোবরের অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশকে অবহিত করা হয়নি; প্রতিমন্ত্রী সেখানে যাওয়ার পর পুলিশকে খবর দেওয়া হয় এবং পরে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

এই বক্তব্যগুলো থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: কোনো এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হওয়ার পরও যদি মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা দরকার কি না।

অবশ্যই দরকার। তবে সেই মূল্যায়ন হতে হবে তথ্য, মামলা, গ্রেপ্তার, মাদক জব্দ, পুনরায় অপরাধের হার এবং বিচারিক ফলাফলের ভিত্তিতে। শুধু কয়েকটি অভিযানের সংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণ সফল হয়েছে কিংবা ব্যর্থ হয়েছে—কোনোটিই চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় না।

জনপ্রতিনিধিরা মাঠে নামলে কী পরিবর্তন হতে পারে?

মাদকবিরোধী লড়াইয়ে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পক্ষে কয়েকটি শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে।

প্রথমত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরাধ দমনের পরিবেশ তৈরি করে। কোনো এলাকার জনপ্রতিনিধি যদি মাদক কারবারের অভিযোগকে গুরুত্ব দেন, নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা সভা করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে অগ্রগতির হিসাব চান, তাহলে বিষয়টি প্রশাসনিক অগ্রাধিকারে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় মানুষের আস্থা বাড়তে পারে। মাদক সমস্যায় আক্রান্ত পরিবারগুলো অনেক সময় ভয়, সামাজিক সংকোচ কিংবা নিরাপত্তার আশঙ্কায় অভিযোগ করতে চায় না। জনপ্রতিনিধিরা নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা, গোপনীয়তা রক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তার উদ্যোগ নিলে মানুষ কথা বলার সুযোগ পেতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। কোনো এলাকায় বারবার মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলেও একই অপরাধপ্রবণতা ফিরে এলে তার কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। অপরাধীরা কীভাবে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করছে, মামলার অগ্রগতি কী, জামিনের পর অপরাধে ফেরার ঘটনা আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে চাওয়া জনপ্রতিনিধিদের বৈধ নাগরিক ও রাজনৈতিক ভূমিকার অংশ।

চতুর্থত, মাদকবিরোধী উদ্যোগ সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, স্থানীয় ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন, চিকিৎসক এবং পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করা গেলে মাদকবিরোধী প্রচেষ্টা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযাননির্ভর থাকবে না।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। একজন জনপ্রতিনিধি যদি নিজের এলাকার মাদক সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেন, অন্য জনপ্রতিনিধিরাও নিজ নিজ এলাকায় একই ধরনের কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত হতে পারেন। তবে সেই উদ্যোগ হতে হবে আইনসম্মত, সমন্বিত এবং জবাবদিহিমূলক।

এই যুক্তিগুলোর ভিত্তিতে বলা যায়, মাদকবিরোধী কাজে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়। বরং তাঁদের সক্রিয়তা কীভাবে আরও কার্যকর, নিরাপদ ও আইনসম্মত করা যায়, সেই আলোচনা সামনে আনা দরকার।

তবে অস্ত্র প্রদর্শনের প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যাবে না

ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসম্মত বলে ধরে নিতে হবে।

জননিরাপত্তা বিভাগের প্রকাশিত ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালায় আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সভুক্ত অস্ত্র বহন বা ব্যবহারের সুযোগের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে অন্যের মধ্যে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা এক বিষয় নয়। পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য, তাৎক্ষণিক বিপদের প্রকৃতি এবং প্রযোজ্য বিধান বিবেচনা করেই বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে।

ইশরাক হোসেনের বক্তব্য হলো, তিনি সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। অন্যদিকে, ভিডিও দেখে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, সেখানে অস্ত্র প্রদর্শনের মতো তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না। ভিডিওর সীমিত অংশ দেখে সব পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়; তাই তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা জরুরি।

১৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘটনাটি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

এটাই হওয়া উচিত আইনের শাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রশংসা করা যাবে, আবার একই সঙ্গে অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তও চাওয়া যাবে। দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী নয়।

প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা হোক

মাদক কারবারের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী।

যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে, সেখানে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা যেতে পারে: অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, অভিযানগুলোর ফল কী, জব্দ করা মাদকের উৎস সম্পর্কে তদন্ত হয়েছে কি না, মামলাগুলোর অগ্রগতি কতটুকু এবং কোনো কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।

এ ধরনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে সৎ কর্মকর্তারা উৎসাহিত হবেন এবং অপরাধের সঙ্গে কারও যোগসাজশ থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

একইভাবে, জনপ্রতিনিধিদেরও তাঁদের গৃহীত উদ্যোগের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। কতটি অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে, কতজন প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কতজন মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন এবং অপরাধপ্রবণতা কতটা কমেছে—এসব সূচক দিয়ে উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সম্ভব।

তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় চাই কঠোরতা ও মানবিকতা—দুটিই

মাদক সমস্যার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এতে আক্রান্ত হতে পারে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। তরুণদের শিক্ষা, কর্মজীবন, মানসিক সুস্থতা এবং পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি মাদকাসক্ত মানুষদেরও চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে।

তাই মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে একদিকে মাদক উৎপাদন, পাচার ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; অন্যদিকে আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সমাজে ফিরে আসার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু ভয় দেখিয়ে কিংবা বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা, মাদকের সরবরাহ বন্ধ করা, অর্থের উৎস অনুসন্ধান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা এবং পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধ।

এই কাজে জনপ্রতিনিধিরা যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং সামাজিক নেতৃত্ব দিতে পারেন, তাহলে তাঁদের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইশরাকের ঘটনা থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য কী শিক্ষা?

ইশরাক হোসেনের গেণ্ডারিয়ার অভিযান নিয়ে বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে তদন্ত ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে। কিন্তু এই ঘটনা মাদক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে একটি বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

সরকারের দায়িত্ব শুধু অভিযান পরিচালনা নয়; মাদকবিরোধী নীতির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্ষম করা, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং তরুণদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করাও তার দায়িত্ব।

একইভাবে, বিরোধী দল, ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোরও উচিত দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সহযোগিতা করা।

তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাঠে নামার অর্থ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ শনাক্ত করবেন, জনমত গড়বেন, প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাইবেন, প্রয়োজনীয় সমন্বয় করবেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবেন। অভিযান পরিচালনা, সন্দেহভাজনকে আটক, তল্লাশি ও বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি ক্ষমতা ও পদ্ধতি মানতে হবে।

মাদকবিরোধী লড়াইয়ে একজন জনপ্রতিনিধির সক্রিয় ভূমিকা প্রশংসার যোগ্য হতে পারে, যদি সেই ভূমিকা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অপরাধ দমনে বাস্তব ফল আনে এবং আইনের সীমারেখার মধ্যে থাকে। ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রে তাঁর ঘোষিত মাদকবিরোধী অবস্থানকে মূল্যায়নের পাশাপাশি অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হলে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিচারব্যবস্থা, সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পরিবার ও সমাজ—সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রশাসনকে বাদ দিয়ে নয়, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেই জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় হতে হবে।

মাদকবিরোধী উদ্যোগের পক্ষে দাঁড়ানো মানে কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা নয়; বরং অপরাধ দমনের কার্যকর উদ্যোগকে সমর্থন করা এবং একই সঙ্গে নিশ্চিত করা—আইন সবার জন্য সমান।

— CSB NEWS USA | বিশেষ প্রতিবেদন

ট্যাগ: মাদকেরবিরুদ্ধেমাঠেনামলেইবিতর্কঅথচ

প্রতিবেদক

Saifur Rahman

Bangladesh Correspondent

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।