ইলহান ওমরের নাগরিকত্ব নিয়ে তদন্ত, পুরোনো নথি ঘিরে নতুন বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে
ইলহান ওমরের বাসভবনে তল্লাশি, পুরোনো অভিবাসন নথি নিয়ে নতুন তদন্ত এবং আইনজীবীদের আইনি পদক্ষেপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বাড়ছে বিতর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের নাগরিকত্ব ও পুরোনো অভিবাসন নথি নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর ওয়াশিংটনে তাঁর বাসভবনে তল্লাশি চালান কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা। এ ঘটনার পর তাঁর পরিবারের অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র, জন্মতারিখ এবং নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ওমরের আইনজীবীরা তল্লাশিতে জব্দ করা সামগ্রী ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে তদন্ত চললেও তাঁর নাগরিকত্ব জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, এমন অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ নিশ্চিত করেছে, ১২ অক্টোবর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আদালতের অনুমোদিত পরোয়ানার ভিত্তিতে তল্লাশি চালান। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তের সঙ্গে কয়েক দশক আগের অভিবাসন ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত নথিতে সম্ভাব্য মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের সব তথ্য প্রকাশ করেনি।
ওমর মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য এবং ডেমোক্র্যাট দলের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ওমর পরিবারের সঙ্গে গৃহযুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। কয়েক বছর শরণার্থীশিবিরে থাকার পর ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। ২০০০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন। ২০১৮ সালে প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর জন্মতারিখ। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের আইনসভাসংশ্লিষ্ট একটি জীবনীভান্ডারে আগে ওমরের জন্মসাল ১৯৮১ উল্লেখ ছিল। ২০১৯ সালে তাঁর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সেটি সংশোধন করে ১৯৮২ করা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের জন্মসালটি ভুল ছিল।
তদন্তকারীরা পরীক্ষা করছেন, নাগরিকত্ব অর্জনের সময় বয়সসংক্রান্ত কোনো তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল দেওয়া হয়েছিল কি না। কারণ, তৎকালীন প্রযোজ্য আইনের অধীনে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান তার বাবা বা মায়ের নাগরিকত্ব অর্জনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নাগরিকত্ব পেতে পারত। তবে কোনো জীবনীতে জন্মসাল সংশোধন করা হয়েছে বলেই অভিবাসন আবেদনে জালিয়াতি হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ বিষয়ে প্রকৃত জন্মতারিখ, আবেদনপত্র এবং নাগরিকত্ব অর্জনের সময়কার নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তের আরেকটি বিষয় ওমরের প্রয়াত বাবা নুর ওমর মোহামেদের অতীত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি সোমালিয়ার সাবেক সামরিক বাহিনীতে কর্নেল পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তদন্তকারীরা তাঁর অভিবাসন আবেদনে সামরিক দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করাই অভিবাসন জালিয়াতির প্রমাণ নয়। কোনো তথ্য গোপন করা হয়েছিল কি না, সেটি নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে ওমর বা তাঁর বাবার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
এই তদন্ত নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য এসেছে ওয়াশিংটন পোস্টের ১৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন থেকে। পত্রিকাটি জানিয়েছে, ২০১৯ সালেও তৎকালীন প্রশাসনের কর্মকর্তারা ওমরের অভিবাসনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করেছিলেন। সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই পর্যালোচনায় অনিয়মের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয়েছিল। বর্তমান তদন্তে আবারও প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অবশ্য আগের পর্যালোচনায় যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়া মানেই বর্তমান তদন্তে নতুন কোনো প্রমাণ পাওয়া অসম্ভব, এমন নয়। একইভাবে আগের অভিযোগ আবার সামনে এসেছে বলেই সেগুলো সত্য প্রমাণিত হয়েছে, এমনটিও নয়। বর্তমান তদন্তের ফল কী হবে, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।
১৭ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমরের আইনজীবীরা তাঁর বাসভবন থেকে জব্দ করা সামগ্রী ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা তদন্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করেছেন, এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁদের বক্তব্য, তদন্তের নামে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে হয়রানি করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তল্লাশি আদালতের অনুমোদিত পরোয়ানার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব বাতিলের আইনগত প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। নাগরিকত্ব অর্জনের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন বা জালিয়াতি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠলেই তাৎক্ষণিকভাবে নাগরিকত্ব বাতিল করা যায় না। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। নাগরিকত্বের সনদ সংশোধন বা প্রত্যাহারের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং প্রকৃত নাগরিকত্ব বাতিলের আইনি প্রক্রিয়াও এক নয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেস সদস্য হওয়ার জন্য নাগরিকত্বসহ নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। কিন্তু কোনো তদন্ত শুরু হওয়া মানেই একজন জনপ্রতিনিধির নাগরিকত্ব বা পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া নয়।
ইলহান ওমরের বাসভবনে তল্লাশি, পুরোনো অভিবাসন নথি নিয়ে নতুন অনুসন্ধান এবং আইনজীবীদের আইনি পদক্ষেপ সবই সাম্প্রতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে নাগরিকত্ব জালিয়াতির অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। ২০১৯ সালের পর্যালোচনা, বর্তমান তদন্তের ফল এবং আদালতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে এখন নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল নিশ্চিত এমন দাবি করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না।
বাসভবনে তল্লাশি ও আইনজীবীদের সামগ্রী ফেরত চাওয়ার খবর একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। জন্মসাল সংশোধন এবং আগের পর্যালোচনার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্ব জালিয়াতি বা নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।





