ফিলিস্তিনিদের ভূমি হারানো নিয়ে ইসরায়েলের সমালোচনায় মুখ খুললেন ওবামা
ফিলিস্তিনিদের ভূমি হারানোর প্রসঙ্গ তুলে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গাজায় সহিংসতা বন্ধ ও স্থায়ী শান্তির আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
ফিলিস্তিনিদের ভূমি হারানো, গাজায় চলমান মানবিক সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও ভূমি হারানোর বিষয়টি উপেক্ষা করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন। তাঁর এই বক্তব্য ১৪ ও ১৫ অক্টোবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
বেলফাস্টের ওটু অ্যারেনায় লেখক ও সাংবাদিক সুসান ম্যাককের সঙ্গে আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে কথা বলেন ওবামা। ওই সফরে তিনি কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্ট থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিও গ্রহণ করেন। আলোচনায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের সংঘাত, গাজার মানুষের দুর্ভোগ এবং ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উঠে আসে।
ওবামা বলেন, ইহুদি জনগোষ্ঠী দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে নিপীড়ন, বৈষম্য ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ইউরোপেও তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা থেকে ইহুদিরা নিজেদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা অঞ্চলে আশ্রয় খুঁজেছে—এ বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, সেই প্রক্রিয়ায় অন্য মানুষের ভূমি নেওয়া হয়েছে এবং বাড়াবাড়িও ঘটেছে। এর ফলে যাঁরা নিজেদের ভূমি হারিয়েছেন, তাঁরা অন্যায় হয়েছে বলে মনে করেছেন এবং নিজেদের জমি ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ওবামার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেই ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও তাঁদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, কোনো দেশ সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিশালী হলেই নিজেদের ইচ্ছামতো সবকিছু করতে পারে—এমন নীতি দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। বরং শক্তিশালী পক্ষ যদি অন্য পক্ষের অধিকার ও ন্যায্য দাবিকে উপেক্ষা করে, তাহলে সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে স্বল্পমেয়াদে কিছু লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলি সরকারের নিরাপত্তানীতির পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ পায়। তিনি মনে করেন, ওই অঞ্চলে বসবাসরত ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তবতা মেনে নিয়েই শান্তির পথ খুঁজতে হবে। কোনো জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
গাজার পরিস্থিতি নিয়েও ওবামা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সেখানে চলমান দুর্ভোগ এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কঠোর অবস্থানের বিস্তার স্বল্পমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলেছে। তাঁর মতে, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনায় যাওয়ার আগে সহিংসতা প্রকৃত অর্থে বন্ধ করা এবং গাজার মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা জরুরি। যুদ্ধ ও প্রতিশোধের ধারাবাহিকতা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করতে পারে।
তবে ওবামা শুধু ইসরায়েলের সমালোচনা করেই বক্তব্য শেষ করেননি। তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার কথাও উল্লেখ করেন এবং হামাসের সহিংস কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ফিলিস্তিনিদেরও বুঝতে হবে যে সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলকে পরাজিত করাই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের পথ নয়। ন্যায়সংগত দাবি, নৈতিক অবস্থান, অহিংস কৌশল এবং রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ খুঁজতে হবে।
ওবামার বক্তব্যের পর ইসরায়েলের ভূমি ও নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাল্টা প্রতিক্রিয়াও উঠে আসে। নেতানিয়াহু বলেন, ইহুদি জনগণের ওই অঞ্চলের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার অধিকারকে অস্বীকার করা যায় না। ফলে বিষয়টি শুধু ফিলিস্তিনিদের ভূমি হারানোর প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ঐতিহাসিক দাবি এবং দুই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ক সামনে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের স্থায়ী সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার, নিরাপত্তা, ভূমি, গাজার পুনর্গঠন এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা—এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক। বেলফাস্টে ওবামার বক্তব্যও সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে তাঁর মন্তব্যকে ফিলিস্তিনিদের সব রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং বক্তব্যে তিনি ফিলিস্তিনিদের ভূমি হারানোর অভিজ্ঞতা ও অধিকার নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি হামাসের হামলার নিন্দা এবং অহিংস রাজনৈতিক পথের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছেন।





