ভারতে ১ নভেম্বর থেকে অচেনা কলদাতার নাম দেখানো বাধ্যতামূলক প্রতারণা ঠেকাতে নিয়ম
ভারতে ১ নভেম্বর থেকে অচেনা দেশীয় কলের নম্বরের সঙ্গে নিবন্ধিত নামও দেখাবে; বিদেশি কল ও নাম গোপনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকবে।
ভারতে মোবাইল ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলে এবার শুধু নম্বর নয়, কলদাতার নামও দেখানোর ব্যবস্থা চালু হতে যাচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে দেশটির চতুর্থ প্রজন্ম ও তার পরবর্তী প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্কে এই ব্যবস্থা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে ভারতের টেলিযোগাযোগ বিভাগ। মূল লক্ষ্য হলো ভুয়া পরিচয়ে ফোন করা, আর্থিক প্রতারণা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক কল শনাক্ত করতে গ্রাহকদের সহায়তা করা। তবে নতুন নিয়মটি সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু দাবির সঙ্গে সরকারি নির্দেশের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
ভারতের টেলিযোগাযোগ বিভাগের ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের নির্দেশ অনুযায়ী, সব সংশ্লিষ্ট টেলিযোগাযোগ সেবাদাতাকে ১ নভেম্বর থেকে নিজ নিজ সেবাক্ষেত্রে কলদাতার নাম প্রদর্শনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এই ব্যবস্থার নাম কলিং নেম প্রেজেন্টেশন। সহজভাবে বললে, ফোনে কল আসার সময় কলদাতার নম্বরের পাশাপাশি তাঁর সংযোগের নিবন্ধিত নামও দেখানো হবে। নির্দেশটি বাস্তবায়নের জন্য গ্রাহককে আলাদাভাবে আবেদন করতে হবে না। সরকারি নির্দেশের ভিত্তিতে খবরটি নিশ্চিত হলেও, সব ধরনের ফোন ও নেটওয়ার্কে একই দিনে ব্যবস্থা চালু হবে এমন দাবি সঠিক নয়।
নতুন ব্যবস্থায় পরিচিত ও অপরিচিত নম্বরের ক্ষেত্রে নাম দেখানোর নিয়ম এক নয়। কোনো ব্যক্তির নম্বর যদি গ্রাহকের ফোনে আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে, তাহলে ফোনের পরিচিতি তালিকায় থাকা নামটিই অগ্রাধিকার পাবে। আর নম্বরটি সংরক্ষিত না থাকলে দেশের ভেতর থেকে আসা কলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকতথ্যে থাকা নাম দেখানো হবে। অর্থাৎ, অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলেও গ্রাহক সম্ভাব্য কলদাতার পরিচয় সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি তথ্য পাবেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রদর্শিত নামটি যে ব্যক্তি ফোন করছেন তাঁর পরিচয়ের শতভাগ নিশ্চয়তা নয়। নামটি মূলত সংশ্লিষ্ট সংযোগের নিবন্ধিত গ্রাহকতথ্যের ওপর নির্ভর করবে। কেউ অন্যের নামে নিবন্ধিত সংযোগ ব্যবহার করলে অথবা নিবন্ধিত তথ্যে ভুল থাকলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই ফোনের পর্দায় পরিচিত কোনো নাম দেখালেই সেটিকে প্রতারণামুক্ত কলের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বিদেশ থেকে ভারতে আসা কলের ক্ষেত্রে নিয়মটি আলাদা। কোনো বিদেশি নম্বর গ্রাহকের পরিচিতি তালিকায় সংরক্ষিত না থাকলে পর্দায় কলদাতার ব্যক্তিগত নামের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক কল বোঝানো বার্তা দেখানো হবে। ফলে বিদেশি কলের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্ণ নাম প্রদর্শন করা হবে—এমন দাবি সরকারি নির্দেশের সঙ্গে মেলে না। একইভাবে, যেসব গ্রাহক অনুমোদিতভাবে কলারের পরিচয় গোপন রাখার সুবিধা ব্যবহার করেছেন, তাঁদের নামও প্রদর্শন করা হবে না।
নতুন নিয়মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রাথমিকভাবে এটি চতুর্থ প্রজন্ম ও তার পরবর্তী প্রযুক্তির বেতার মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। অর্থাৎ, চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক এই ব্যবস্থার আওতায় পড়বে। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক এবং প্রচলিত তারযুক্ত টেলিফোন ব্যবস্থায় এটি চালুর বিষয়টি আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে। তাই ১ নভেম্বর থেকেই ভারতের সব ধরনের টেলিফোন সংযোগে একই সুবিধা পাওয়া যাবে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ব্যবসায়িক সংযোগের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা বিপুলসংখ্যক সংযোগ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে নিবন্ধিত ব্যক্তির নামের পরিবর্তে যাচাইকৃত ব্যবসায়িক নাম প্রদর্শনের সুযোগ পেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে নামটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ব্যবসায়িক নাম অথবা নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতীকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করতে হবে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো অন্য প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে নিজের নাম প্রদর্শন করতে পারবে না।
গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টিও সরকারি নির্দেশে গুরুত্ব পেয়েছে। কলদাতার নাম শনাক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব তথ্যভান্ডার পরিচালনা করতে হবে। প্রাপক প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক সেই তথ্যভান্ডার থেকে প্রয়োজনীয় নাম সংগ্রহ করে গ্রাহকের ফোনে প্রদর্শন করবে। নির্দেশে এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে কল শেষ হওয়ার পর নাম শনাক্ত করার অনুসন্ধানসংক্রান্ত তথ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংরক্ষিত না থাকে। পাশাপাশি, ভুল নাম প্রদর্শনসহ এ-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও রাখতে হবে। তবে বাস্তবে এই সুরক্ষা কতটা কার্যকর হবে, তা বাস্তবায়নের পর পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
এই উদ্যোগের পেছনে ভারতের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের আগের সুপারিশও রয়েছে। সংস্থাটি ২০২৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কলদাতার নাম প্রদর্শনব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সুপারিশ প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রশাসনিক নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় এবার দেশজুড়ে ব্যবস্থা চালুর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থাটি প্রতারণা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী কিংবা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে করা সন্দেহজনক কল শনাক্ত করার ক্ষেত্রে। কিন্তু নাম প্রদর্শনের সুবিধা চালু হলেই সব ধরনের প্রতারণা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রতারকরা অন্যের নিবন্ধিত সংযোগ ব্যবহার করতে পারে কিংবা কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। তাই অপরিচিত ব্যক্তিকে কখনোই ব্যাংকের গোপন সংকেত, এককালীন যাচাইকরণ সংকেত, ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য বা অর্থ পাঠানোর তথ্য দেওয়া উচিত নয়। সন্দেহজনক কল এলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যাচাইকৃত যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করা নিরাপদ।
ভারতের ১ নভেম্বরের উদ্যোগটি কলদাতার পরিচয় শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিবন্ধিত তথ্যের নির্ভুলতা, প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং গ্রাহকদের সচেতনতার ওপর। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়মটি ভারতের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য; এটি বাংলাদেশের মোবাইল গ্রাহকদের জন্য একই দিনে কার্যকর হওয়ার কোনো ঘোষণা নয়।





