ইরানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে ২৩ বছর বয়সী তরুণী নাজমেহ আমিনিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কথিত অবমাননাকর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে এ রায় দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট বক্তব্য বা প্রকাশনার সম্পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ঠিক কী লিখেছিলেন বা প্রকাশ করেছিলেন, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো চূড়ান্ত নয়। ইরানের সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন এবং ৯ অক্টোবর প্রকাশিত ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, নাজমেহ আমিনি ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের বাসিন্দা। তিনি হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তাঁকে মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি অন্য একটি মামলায় তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। ওই মামলায় জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
মানবাধিকারকর্মীদের কাছে ঘটনাটি বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তাঁদের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের জন্য মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। ঘটনার সূত্রপাত ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময়। বিভিন্ন মানবাধিকার সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের একপর্যায়ে রাজনৈতিক দাবিও সামনে আসে। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ওই আন্দোলনের সময় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় এবং পাঁচ লাখ নয়, বরং পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা। এসব সংখ্যার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই অবশ্য কঠিন। নাজমেহ আমিনির গ্রেপ্তার ও পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে কিছু তারিখের পার্থক্য রয়েছে। ইরান হিউম্যান রাইটসের ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কর্মকাণ্ড নজরদারির পর ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে, হেঙ্গাও নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের ২৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারির শেষ দিকে মাশহাদের ফেরদৌসি বাজার এলাকায় বিক্ষোভের সময় তিনি প্রথম আটক হন। অর্থাৎ, তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সূত্রপাত ও বিভিন্ন পর্যায়ে আটক থাকার ঘটনাগুলো আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ইরানের সাইবার পুলিশ তাঁর অনলাইন কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেছিল। প্রাথমিকভাবে শিয়া ইসলামের সম্মানিত ইমামদের অবমাননার অভিযোগ সামনে আসে। পরে মামলায় মহানবীকে অবমাননার অভিযোগ যুক্ত হয়। ইরানের খোরাসান প্রদেশের একটি আদালতের ষষ্ঠ শাখায় তাঁর বিচার হয়। ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, আদালত তাঁকে মহানবীকে অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তবে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আদালতের নথি ও প্রকাশিত প্রমাণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
মামলায় নাজমেহ আমিনির আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ইরানের সংবাদপত্র খোরাসানের বরাতে ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, আদালতে তিনি দাবি করেন, কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মাদকজাতীয় বিভ্রম সৃষ্টিকারী মাশরুম গ্রহণের পর অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় তিনি ওই বক্তব্য প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আইনজীবীও বক্তব্যটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। তবে আদালত তাঁর এই যুক্তি গ্রহণ করেনি।
মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিচারক তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই অবস্থায় থাকলে তিনি কেন অন্য ব্যক্তি বা সরকারের বিরোধীদের উদ্দেশে একই ধরনের মন্তব্য করেননি, সে বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে আদালতের কার্যবিবরণীর সম্পূর্ণ নথি প্রকাশ্যে না থাকায় বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইরানের আইনে ধর্মীয় অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ইরানের ইসলামি দণ্ডবিধির ২৬২ নম্বর ধারায় মহানবী বা অন্য নবীকে অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। তবে ২৬৩ নম্বর ধারায় জবরদস্তি, অনিচ্ছাকৃত ভুল, অসতর্কতা, নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থা বা নেশাগ্রস্ততার মতো কিছু পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমের বিধানও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি এসব পরিস্থিতির কথা বললেই যে আদালত তা গ্রহণ করবে, এমন নয়; অভিযোগ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের মূল্যায়ন বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ। আমিনির মামলায় তাঁর আইনজীবীর যুক্তি ও তাঁর নিজের বক্তব্য আদালত গ্রহণ করেনি বলে মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে। এই মামলায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পাশাপাশি আলাদা মামলায় দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুসারে, জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণার অভিযোগে তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুধু ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগেই সীমাবদ্ধ ছিল না; রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগও এতে যুক্ত হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা এ কারণে মামলাটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তবে অভিযোগগুলো আদালতে কীভাবে প্রমাণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নথি ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সমীচীন নয়।
কারাগার থেকে প্রকাশিত একটি শব্দবার্তায় নাজমেহ আমিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বার্তায় তিনি জাতিসংঘ, আইনজীবী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে তাঁর মামলা পর্যালোচনা করার আহ্বান জানান। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বিশ্বের মানুষের কাছে তাঁর কথা তুলে ধরার অনুরোধ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল আবেদন ছিল, তাঁর মামলাটি যেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যালোচনা করা হয় এবং তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। বার্তাটির উদ্ধৃতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও সম্পূর্ণ বিচারিক নথি ও সংশ্লিষ্ট সব প্রমাণ জনসমক্ষে নেই। নাজমেহ আমিনির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটির পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের কারণে একজন তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এ ধরনের শাস্তি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরও কঠোর প্রভাব ফেলতে পারে। সংগঠনটি রায় বাতিলের দাবি জানিয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও অতীতে এমন শাস্তি কার্যকর হয়েছে। ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৮ মে ইউসুফ মেহরদাদ ও সদরোল্লাহ ফাজেলি জারে নামের দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননাসংক্রান্ত অভিযোগ ছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে। এই অতীত ঘটনাগুলোর কারণে আমিনির মামলাকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে বর্তমান মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় হলো, নাজমেহ আমিনির মৃত্যুদণ্ড এখনো চূড়ান্ত নয়। ইরানের সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে এবং পরবর্তী বিচারিক পর্যালোচনায় রায় বহাল থাকবে, পরিবর্তিত হবে, নাকি বাতিল হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাই তাঁকে ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে প্রচার করা তথ্য সঠিক হবে না। বর্তমানে নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং কারাগারে আটক রয়েছেন।