বঙ্গোপসাগরে নজরদারিতে চার উপগ্রহ, ব্যয় ৬০০ কোটি, জেলেদের নিরাপত্তায় নতুন বড় পরিকল্পনা
বঙ্গোপসাগরে নজরদারি জোরদার করতে চারটি কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ, এতে নৌযান শনাক্তকরণ ও জেলেদের নিরাপত্তা বাড়ানোর আশা রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে নজরদারি বাড়াতে চারটি কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করা, অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ, সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা এবং গভীর সাগরে বিপদে পড়া জেলেদের নিরাপত্তা জোরদার করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। তবে প্রকল্পটি এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে উপগ্রহগুলো কবে উৎক্ষেপণ করা হবে, কখন থেকে নজরদারি শুরু হবে এবং চূড়ান্ত ব্যয় কত দাঁড়াবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রথম আলোর ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় চারটি স্বল্প উচ্চতায় অবস্থানকারী কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে দুটি ভূকেন্দ্র এবং দেশে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব অবকাঠামো। পুরো ব্যবস্থার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট এলাকাগুলো সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের ব্যবধানে আবার পর্যবেক্ষণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো একটি এলাকায় উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের পর পরবর্তী পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত ব্যবধান আধা ঘণ্টার মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি প্রতিটি নৌযানের অবস্থান প্রতি মুহূর্তে সরাসরি দেখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নয়।
বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশাল জলসীমায় মাছ ধরা, নৌযান চলাচল, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ এবং পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এত বড় এলাকায় শুধু উপকূল থেকে নজরদারি চালানো কঠিন। সমুদ্রে কোনো নৌযান কোথায় যাচ্ছে, কোথায় মাছ ধরছে কিংবা নির্ধারিত এলাকার বাইরে চলে যাচ্ছে কি না, তা দ্রুত জানতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে নৌযান শনাক্তকরণের উন্নত প্রযুক্তি। বর্তমানে প্রচলিত স্বয়ংক্রিয় নৌযান শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি নৌযানের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। সাধারণ ব্যবস্থায় উপকূলীয় গ্রহণকেন্দ্রের মাধ্যমে এসব সংকেত সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু গভীর সমুদ্রে উপকূল থেকে দূরত্ব বেড়ে গেলে সংকেত গ্রহণে সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। মহাকাশে থাকা উপগ্রহের মাধ্যমে সংকেত গ্রহণ করা গেলে দূরবর্তী সমুদ্র এলাকায় চলাচলরত নৌযানের তথ্য সংগ্রহের সুযোগ বাড়ে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোনো নৌযানে উপযুক্ত সংকেত পাঠানোর যন্ত্র না থাকলে কিংবা যন্ত্রটি বন্ধ থাকলে শুধু এই ব্যবস্থার সাহায্যে সেটিকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। অর্থাৎ, চারটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করলেই বঙ্গোপসাগরের প্রতিটি নৌকা, ট্রলার ও জাহাজের অবস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানা যাবে, এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কোন ধরনের নৌযান এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে, কতগুলো নৌযানে প্রয়োজনীয় যন্ত্র বসাতে হবে এবং সংকেতবিহীন নৌযান শনাক্তে বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না, তা প্রকল্পের কারিগরি পরিকল্পনায় স্পষ্ট করতে হবে।
বাংলাদেশের মৎস্য খাতের জন্য এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুফলও রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৩০ হাজার ছোট আকারের মাছ ধরার নৌযান নিবন্ধিত রয়েছে। এর বাইরে আরও অন্তত ৭০ হাজার অনিবন্ধিত নৌকা থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ধারণা। এই বিপুলসংখ্যক নৌযানের মধ্যে কোনগুলো সমুদ্রে যাচ্ছে, কোথায় মাছ ধরছে এবং কোন নৌযান নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি কার্যকর হলে সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমোদিত এলাকা পর্যবেক্ষণ, নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরা শনাক্ত এবং অবৈধভাবে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রসীমায় সন্দেহজনক নৌযানের চলাচল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব হতে পারে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তির সক্ষমতা, নৌযানগুলোর যন্ত্রপাতি, তথ্যের নির্ভুলতা এবং নজরদারির তথ্য ব্যবহার করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।
জেলেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়, উত্তাল ঢেউ, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা পথ হারানোর কারণে জেলেদের বিপদে পড়ার ঘটনা ঘটে। কখনো ট্রলার ডুবে যায়, কখনো জেলেরা সাগরে ভেসে দূরে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে বিপদগ্রস্ত নৌযানের সর্বশেষ অবস্থান জানা থাকলে উদ্ধারকারী দলকে সঠিক এলাকায় পাঠানো সহজ হতে পারে। এতে অনুসন্ধানের সময় কমানো এবং দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে উপগ্রহের মাধ্যমে নৌযানের অবস্থান জানা গেলেই উদ্ধার নিশ্চিত হয়ে যায় না। বিপদসংকেত গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো, উদ্ধারকারী নৌযানের প্রস্তুতি এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করে অভিযান পরিচালনার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। জেলেদের নিরাপত্তা বাড়াতে নৌযানে অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্রের পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম, আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রকল্প থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও দেখছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড। নৌযানের অবস্থান ও চলাচলের তথ্য ব্যবহার করে মাছ ধরার পরিকল্পনা এবং সমুদ্রপথ নির্ধারণ করা গেলে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমতে পারে। ফলে ডিজেল খরচ কমানো এবং সময় বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির হিসাবের বরাতে বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে যাত্রা পরিচালনা করতে পারলে একটি নৌযানে প্রতি যাত্রায় সর্বোচ্চ ১৫০ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হতে পারে। বছরে মোট ৪ কোটি ৫০ লাখ লিটার জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো সম্ভাব্য হিসাব; বাস্তবে কতটা সাশ্রয় হবে, তা নৌযানের সংখ্যা, যাত্রার দূরত্ব, আবহাওয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের ভেতরে সামুদ্রিক তথ্য সংরক্ষণ। প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় অবকাঠামোতে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক তথ্যের ওপর দেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং নৌযান চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য এ ধরনের তথ্য দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগতে পারে।
বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৮ সালে। এটি মূলত যোগাযোগ, সম্প্রচার ও সংকেত আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহৃত হয়। নতুন প্রস্তাবিত উপগ্রহব্যবস্থার উদ্দেশ্য আলাদা। এর মূল লক্ষ্য হবে সমুদ্রে নৌযানের সংকেত গ্রহণ ও চলাচল পর্যবেক্ষণ। ফলে নতুন উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মহাকাশপ্রযুক্তির ব্যবহার যোগাযোগের গণ্ডি পেরিয়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ব্যয় ও সুফল ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। চারটি উপগ্রহ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো সমুদ্র এলাকায় পর্যবেক্ষণ চালানো সম্ভব হবে কি না, উপগ্রহগুলোর কার্যক্ষমতা কত দিন থাকবে, উৎক্ষেপণ ও রক্ষণাবেক্ষণে কত অর্থ লাগবে এবং প্রয়োজনীয় নৌযান শনাক্তকারী যন্ত্র বসাতে অতিরিক্ত ব্যয় কত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশি উপগ্রহের মাধ্যমে সেবা নেওয়ার তুলনায় নিজস্ব ব্যবস্থা কতটা সাশ্রয়ী হবে, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান অক্টোবরের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করার লক্ষ্য জানিয়েছেন। এরপর কারিগরি বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো সময়মতো নেওয়া হলে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য সময়সীমা, নিশ্চিত বাস্তবায়নসূচি নয়।
সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরে চারটি কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং জেলেদের সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নৌযানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রের ব্যবহার এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছালে এর প্রকৃত সুফল সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।





