সৌদিতে হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরাতে ঢাকার জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ
৫ মিনিটে পড়ুন
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দেশটির সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ বিন জাফর আবিয়াহর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ অনুরোধ জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বৈঠকে নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় যত্নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। রাজধানী রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলায় বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শামা ওবায়েদ সৌদি আরবের সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে হামলায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক জানান এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি কোনোভাবেই কাম্য নয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংযম দেখানো এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, সামরিক সংঘাত বাড়িয়ে না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পথ খুঁজে বের করা। কারণ, এ ধরনের সংঘাতের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বিদেশে কর্মরত শ্রমিক, ভ্রমণকারী, ওমরাহ পালন করতে যাওয়া মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের জীবনেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
বৈঠকে সৌদি কর্তৃপক্ষের মানবিক সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। হামলায় আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় সেবা এবং দেখভালের ব্যবস্থা করায় তিনি সৌদি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংহতি ও সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান সৌদি রাষ্ট্রদূত। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মরদেহ দেশে ফেরানোর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে বৈঠকের পর কোনো নিশ্চিত সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং কয়েকজন আহত ব্যক্তি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তখন নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ চলছিল। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি কর্তৃপক্ষ ও হাসপাতালগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয়ও পরে নিশ্চিত করা হয়। তাঁরা হলেন বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের মো. শাহেদ আহমেদ এবং কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের মো. নাছরুল্লাহ বদরপুরী। তাঁদের একজন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন, অন্যজন ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে দেশটিতে গিয়েছিলেন। একই ঘটনায় আহত বাংলাদেশিদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহেদ আহমেদ সৌদি আরবে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে জেদ্দার একটি প্রকল্পে নলকূপ ও পানির পাইপসংক্রান্ত কাজ করতেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছুটিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে রিয়াদ বিমানবন্দর হয়ে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হন। অন্যদিকে, নাছরুল্লাহ বদরপুরী ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকার সময় তিনি হামলার ঘটনায় প্রাণ হারান। তাঁদের মৃত্যুতে দুই পরিবারের ওপর নেমে এসেছে অপূরণীয় ক্ষতি। স্বজনদের কাছে মরদেহ ফিরিয়ে দেওয়া এখন পরিবারের সদস্যদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
হামলার পর আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহত বাংলাদেশির সংখ্যা ২৪ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদনে এ সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে প্রবাসী কর্মী এবং ওমরাহ পালন করতে যাওয়া ব্যক্তিরা রয়েছেন। আহতদের কেউ কেউ গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ফলে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে হামলার কারণে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বিমান চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদ ও দাম্মামে চলাচলকারী ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। একই ঘটনায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে একাধিক সরাসরি ও যাত্রাবিরতিসহ পরিচালিত ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়। এতে কর্মস্থলে ফেরা প্রবাসী, ওমরাহযাত্রী এবং অন্যান্য যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
বিমান চলাচলে এ ধরনের বিঘ্নের কারণে নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবহন ও আনুষ্ঠানিকতা প্রয়োজন হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে। তবে মরদেহ ফিরিয়ে আনার নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে—এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে নতুন কোনো সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা সমীচীন হবে না।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অসংখ্য পরিবারের জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে সৌদি আরবে নিরাপত্তাজনিত সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, যাতায়াত এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপরও পড়তে পারে। সাম্প্রতিক হামলায় বাংলাদেশিদের প্রাণহানির ঘটনা এ উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা জোরদার করা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বিমান চলাচলের হালনাগাদ পরিস্থিতি সম্পর্কে যাত্রীদের নির্ভরযোগ্য তথ্য জানানোও প্রয়োজন।
সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে শামা ওবায়েদের সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়টি এই প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বৈঠকে সংহতি প্রকাশ, চিকিৎসাসেবায় কৃতজ্ঞতা জানানো এবং মরদেহ ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করা হলেও মরদেহ দেশে পৌঁছানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে সৌদি সরকার ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থেকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য জানা যাবে।