ট্রাম্পকে অভিশংসনে সমর্থন দেবেন না শেরড ব্রাউন, ওহাইওর নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে অভিশংসনের বিরোধিতা করে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগে সমর্থন দেবেন না বলে জানিয়েছেন ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সাবেক সিনেটর ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার সিনেটে ফিরতে চান তিনি। নির্বাচনে জয়ী হলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়াকে সমর্থন করবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রাউন বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ওহাইওর গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবর ওহাইওর সংবাদপত্র কলম্বাস ডেসপ্যাচকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রাউন বলেন, “আমি অন্য সবার হয়ে কথা বলতে পারি না, তবে ট্রাম্পকে অভিশংসনের পক্ষে আমি থাকব না। মধ্যবর্তী নির্বাচনে যা-ই ঘটুক না কেন, এর কোনো কারণ নেই।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তিনি নিজে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগকে সমর্থন করতে চান না।
তবে ব্রাউনের এই অবস্থানকে ট্রাম্পের সব নীতির প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিশংসনের বিরোধিতা করা এবং প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হওয়া দুটি আলাদা বিষয়। সাক্ষাৎকারে ব্রাউন মূলত অভিশংসনের প্রশ্নে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতিটি নীতি বা সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন অনুমান করা সঠিক হবে না।
ব্রাউন এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, ব্যয়, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অভিশংসনের প্রশ্নটি নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের। সেখানে অভিশংসনের প্রস্তাব পাস হলে পরবর্তী বিচার হয় সিনেটে। প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে অপসারণ করতে সিনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অভিশংসনের প্রস্তাব পাস হওয়া এবং সিনেটে দোষী সাব্যস্ত হওয়া পৃথক সাংবিধানিক ধাপ।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে রিপাবলিকান নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনও এ ধরনের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই অভিশংসনের প্রস্তাব আনবে, এমন সিদ্ধান্তকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, সম্ভাব্য পরিকল্পনা এবং বাস্তবে গৃহীত সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ব্রাউনের বর্তমান অবস্থান বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদ দুবার অভিশংসনের অভিযোগ উত্থাপন করেছিল। দুই ক্ষেত্রেই ব্রাউন সিনেটে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, অতীতে তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়ার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু এখন নতুন করে অভিশংসনের উদ্যোগকে সমর্থন করবেন না বলে জানিয়েছেন।
প্রথম অভিশংসন প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রতিনিধি পরিষদ তাঁকে অভিশংসন করে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেটে অনুষ্ঠিত বিচারে তিনি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন পাননি।
দ্বিতীয় অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে হামলার পর। ওই সময় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। প্রতিনিধি পরিষদ তাঁকে দ্বিতীয়বার অভিশংসন করে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেটে অনুষ্ঠিত ভোটে ব্রাউন ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দেন। তবে সেবারও প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায় ট্রাম্প দোষী সাব্যস্ত হননি। দ্বিতীয় বিচারের সময় ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন না।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে ব্রাউনের নতুন বক্তব্যের পাশাপাশি তাঁর অতীতের এই অবস্থানের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে তাঁর বর্তমান মন্তব্যকে রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে ব্রাউন কেন নতুন অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছেন, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাইরে কোনো নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ওহাইওর সিনেট নির্বাচনেও এই বিতর্কের প্রভাব পড়তে পারে। ব্রাউন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডের বিরুদ্ধে। সাবেক সিনেটর জে ডি ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য সিনেটের আসন ছেড়ে দিলে ওহাইওর গভর্নর মাইক ডিওয়াইন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হাস্টেডকে ওই আসনে নিয়োগ দেন। এখন বিশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে আসনটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়েছে ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর।
ব্রাউন ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী বার্নি মোরেনোর কাছে পরাজিত হন। এবার তাঁর লক্ষ্য আবার সিনেটে ফিরে আসা। অন্যদিকে, হাস্টেডের লক্ষ্য নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসনটি ধরে রাখা।
নির্বাচনী প্রচারে ব্রাউন নিজেকে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের পক্ষে থাকা একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। কর্মসংস্থান, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ তাঁর প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কিছু বিষয়ে সহযোগিতা করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ওহাইওর ইস্ট প্যালেস্টাইন এলাকায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দুই দলের আইনপ্রণেতাদের একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, হাস্টেডের শিবির ব্রাউনের অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানকে সামনে আনছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে হাস্টেডের প্রচারশিবিরের একজন মুখপাত্র বলেন, ব্রাউন ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে দুবার তাঁকে অভিশংসনের উদ্যোগের পক্ষে ছিলেন। এখন তিনি নিজেকে মধ্যপন্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। মুখপাত্রের বক্তব্য, ভোটারদের ব্রাউনের এই পরিবর্তিত অবস্থান দেখে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ব্রাউন অতীতে বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগতিশীল রাজনীতিকদের অবস্থানের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করেছেন।
এটি হাস্টেডের নির্বাচনী প্রচারশিবিরের রাজনৈতিক বক্তব্য, স্বাধীনভাবে প্রমাণিত কোনো নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নয়। একইভাবে, ব্রাউনের অভিশংসনবিরোধী মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার চূড়ান্ত প্রভাব ভোটের ফলাফলের আগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে ট্রাম্পের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প হাস্টেডকে সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ব্রাউনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে ওহাইওর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে আসন দখলের লড়াই নয়; বরং জাতীয় রাজনীতিতে দুই দলের জনপ্রিয়তা এবং ভোটারদের মনোভাব যাচাইয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রিয়েলক্লিয়ারপোলিংয়ে সংকলিত বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগ থেকে অক্টোবরের প্রথম দিকের একাধিক জরিপে ব্রাউন ও হাস্টেডের সমর্থনের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কয়েকটি জরিপে ব্রাউন এগিয়ে থাকলেও অন্য জরিপে হাস্টেড সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। জরিপের সময়, নমুনা এবং পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় এগুলোকে নির্বাচনের নিশ্চিত ফল হিসেবে দেখা যাবে না।
ব্রাউনের অভিশংসনবিরোধী বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। একদিকে তিনি অতীতে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন, অন্যদিকে এবার নির্বাচিত হলে নতুন অভিশংসনের উদ্যোগে সমর্থন না দেওয়ার কথা বলেছেন। এই অবস্থান তাঁকে মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করার কৌশল কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা হতে পারে। তবে তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রমাণ এখনো নেই।
সব মিলিয়ে, ব্রাউনের মন্তব্য ওহাইওর সিনেট নির্বাচনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। রিপাবলিকান শিবির তাঁর অতীত ও বর্তমান অবস্থানের পার্থক্যকে প্রচারে ব্যবহার করছে, আর ব্রাউনের সামনে রয়েছে শ্রমজীবী ভোটার, মধ্যপন্থী ভোটার এবং ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, তিনি আবার সিনেটে ফিরতে পারবেন কি না। একই সঙ্গে এই নির্বাচন দেখাবে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন নিয়ে বিতর্ক ও জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ ওহাইওর ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলে।





