শুমার ফের নেতা হতে চান, ডেমোক্র্যাট শিবিরে ক্রমেই বাড়ছে নেতৃত্ব বদলের চাপ
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সিনেটের ডেমোক্র্যাট শিবিরে নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতৃত্ব দেওয়া চাক শুমার আবারও এই পদে থাকতে চান। তবে তাঁর নিজের দলের কয়েকজন নির্বাচনী প্রার্থী তাঁকে সমর্থন করার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি নন। ফলে দলের ভেতরে তাঁর নেতৃত্ব কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনেও শুমারের নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে। তবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে দলের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুমার কেবল একজন জ্যেষ্ঠ সিনেটর নন; তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের কৌশল নির্ধারণ, আইন প্রণয়নের আলোচনা এবং নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। দলের নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য তাঁর অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক প্রভাব বড় শক্তি। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলের পরাজয় এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এখন সেই অসন্তোষ প্রকাশ্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করছে দলের অভ্যন্তরীণ সমর্থন এবং আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলের ওপর।
কানসাস, মিশিগান ও মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের কয়েকজন সিনেট নির্বাচনী প্রার্থী শুমারকে আবারও দলীয় নেতা করার বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চয়তা দেননি বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তাঁরা একই সময়ে শুমারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা একটি বড় নির্বাচনী তহবিলের সহায়তাও নিচ্ছেন। ফলে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সহযোগিতা থাকলেও নেতৃত্বের প্রশ্নে প্রার্থীরা নিজেদের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখতে চাইছেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। কোনো প্রার্থী শুমারকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি না দিলেই তিনি তাঁর বিরোধী হয়ে গেছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রার্থীরা নিজেদের রাজ্যের ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে অনেক সময় জাতীয় নেতাদের বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নিতে চান না। বিশেষ করে যেসব অঙ্গরাজ্যে দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে জাতীয় নেতৃত্বের বিতর্ক থেকে দূরে থাকার কৌশলও তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অতএব, সমর্থন না দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও একে সরাসরি বিদ্রোহ হিসেবে বর্ণনা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
মিশিগানের সিনেটর এলিসা স্লটকিন অবশ্য দলের নেতৃত্ব নিয়ে আরও স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। ২০২৬ সালের জুনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন প্রয়োজন এবং পুরোনো পদ্ধতি আর কাজ করছে না। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, দলকে নিজেদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার আরও স্পষ্ট করতে হবে। সব শ্রেণির ভোটারকে একই সঙ্গে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে গিয়ে দল অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়কে সামনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। তিনি নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও বক্তব্যটিকে শুমারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণের প্রস্তাব হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। স্লটকিনের এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা। ওই নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রেসিডেন্ট পদে পরাজিত হন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস। একই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণও ফিরে পায়। ফলে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নির্বাচনী কৌশল, নেতৃত্বের ধরন এবং ভোটারদের কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে আত্মসমালোচনা শুরু হয়। দলের অনেকের কাছে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতা করলেই কি ভোটারদের সমর্থন পাওয়া যাবে, নাকি জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি প্রতিরোধের মতো বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দিতে হবে? শুমারের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষের আরেকটি বড় কারণ ২০২৫ সালের দীর্ঘ সরকারি অচলাবস্থা। ওই বছরের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নসংক্রান্ত অচলাবস্থা টানা ৪৩ দিন স্থায়ী হয়। পরে অর্থায়নসংক্রান্ত বিল পাস ও প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা শেষ হয়। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম সরকারি অচলাবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অচলাবস্থার সময় বহু কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী বেতন ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হন অথবা সাময়িকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েন। বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে, বিভিন্ন খাদ্যসহায়তা কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহেও সমস্যা দেখা দেয়। এই সংকটের সময় শুমার ও তাঁর দলের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। স্বাস্থ্যবিমার ভর্তুকি অব্যাহত রাখার দাবি ছিল ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান অবস্থান। কিন্তু সরকার চালু করার জন্য অর্থায়নসংক্রান্ত সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় দলের ভেতরে মতভেদ দেখা দেয়। আটজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পক্ষে ভোট দেন। প্রগতিশীল অংশের কিছু নেতা ও সমর্থক এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে যথেষ্ট অগ্রগতি না পেয়েই দল আপস করেছে। শুমার নিজে সমঝোতাটি নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন এবং তাঁর নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে সরকারি অচলাবস্থার পুরো দায় এককভাবে শুমারের ওপর চাপানোও যথাযথ হবে না। অর্থায়নসংক্রান্ত বিল পাসের জন্য সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ এবং প্রেসিডেন্টের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। উভয় দলের অবস্থান, আইনসভায় ভোটের হিসাব এবং সরকারের ব্যয়সংক্রান্ত মতপার্থক্য এই ধরনের সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। শুমারের সমালোচকেরা মনে করেন, তাঁর আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকদের যুক্তি, সরকারি কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং আলোচনার পথ খোলা রাখাও নেতৃত্বের দায়িত্ব। এই দুই অবস্থানের সংঘাতই ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।
শুমারের রাজনৈতিক জীবনে অবশ্য সাফল্যও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে তিনি সিনেটের ডেমোক্র্যাটদের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২১ সালে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা হন। সেই সময়ে তাঁর নেতৃত্বে অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু ও জ্বালানি বিনিয়োগ, ওষুধের ব্যয় কমানো এবং প্রযুক্তি খাতে উৎপাদন বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও আইন প্রণয়নের দক্ষতাকে দলের একটি অংশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রিপাবলিকানদের হাতে। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেটে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ৫৩ এবং ডেমোক্র্যাট ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যদের আসনসংখ্যা ৪৭। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য হলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়ী হয়ে এই ব্যবধান কমানো এবং সম্ভব হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা। তবে কোন অঙ্গরাজ্যে কে জয়ী হবেন, তা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো অনিশ্চিত। কানসাস ও মিশিগানের মতো অঙ্গরাজ্যের লড়াই তাই দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেতৃত্বের সম্ভাব্য বিকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে। সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে মেরিল্যান্ডের সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন, কানেকটিকাটের সিনেটর ক্রিস মারফি এবং হাওয়াইয়ের সিনেটর ব্রায়ান শাটজের নাম সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে এসেছে। তবে তাঁদের কেউ শুমারকে চ্যালেঞ্জ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ভ্যান হলেনও নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেননি। ফলে বিকল্প নেতার নাম আলোচনায় থাকা এবং বাস্তবে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। দলের নেতৃত্ব নির্বাচন সাধারণত সিনেটের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে হয়। তাই নির্বাচনী প্রার্থীরা প্রকাশ্যে কী বলছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের একমাত্র নির্ধারক নয়। বর্তমান সিনেট সদস্যদের সমর্থন, আসন্ন নির্বাচনে দলের ফলাফল এবং শুমার নির্বাচনী প্রচারে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন এসব বিষয় তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। ডেমোক্র্যাটরা যদি নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেন, তাহলে শুমার নিজের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার যুক্তি তুলে ধরে নেতৃত্ব ধরে রাখার সুযোগ পেতে পারেন। বিপরীতে, ফলাফল হতাশাজনক হলে পরিবর্তনের দাবি আরও জোরালো হতে পারে।