ডেঙ্গুতে ভয়াবহ পরিস্থিতি, বাংলাদেশে টিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি, চার ধরনেই বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

ডেঙ্গুতে হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে, শত শত মৃত্যু, চার ধরনের ভাইরাস শনাক্তের পর দেশে টিকা পরীক্ষার উদ্যোগ ভাবছে সরকার।

ডেঙ্গুতে ভয়াবহ পরিস্থিতি, বাংলাদেশে টিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি, চার ধরনেই বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

ডেঙ্গুতে ভয়াবহ পরিস্থিতি, বাংলাদেশে টিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি, চার ধরনেই বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি


বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবর শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় দেশে ডেঙ্গুর টিকার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই ১০ হাজার ৭৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৩৬ জন। বর্ষার পর বৃষ্টিপাত ও বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানির কারণে এডিস মশার প্রজনন পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরনই এখন শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে একই মাত্রার প্রতিরোধ তৈরি হয় না। ফলে একজন ব্যক্তি জীবনে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন।

চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস একই সময়ে দেশে সক্রিয় থাকায় জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। বিশেষ করে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে টিকা পরীক্ষা শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সরকার এখন বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করার কথা ভাবছে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু টিকা বা মশা নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।

বাড়ির ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন, টব এবং বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। শহরের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে দেশে হামের প্রকোপও দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামজনিত জটিলতায় এ বছর এক হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু ও হাম একসঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। জ্বর হলেই নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উচ্চ জ্বরের সঙ্গে শরীরের প্রচণ্ড ব্যথা, দুর্বলতা, বমি, পেটে ব্যথা, রক্তপাত বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

বাংলাদেশে এর আগে ২০২৩ সালে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ওই বছর ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এবারও সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরেও রোগী বাড়ছে। ফলে ঢাকার বাইরে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্স এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সরকার টিকা পরীক্ষার সম্ভাবনা বিবেচনা করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনা।

বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত পরিষ্কার করা, বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা গেলে সংক্রমণের গতি কমানো সম্ভব হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর টিকা পরীক্ষার উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে সেই উদ্যোগের পাশাপাশি এখনই মশা নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের সচেতনতা বাড়ানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর