নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে এআই নিয়ে সতর্কবার্তা, নিয়ন্ত্রণ চাইলেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা
এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে ঝুঁকি বাড়ার সতর্কতা, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে স্বচ্ছতা, নজরদারি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি উঠেছে।
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে এআই নিয়ে সতর্কবার্তা, নিয়ন্ত্রণ চাইলেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার নিয়ে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়েছে। সেখানে প্রযুক্তি খাতের সাবেক কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া দ্রুত উন্নত হতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এআই কোম্পানিগুলোর নিজেদের স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যথেষ্ট নয় বলে মত দিয়েছেন কয়েকজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ।
সোমবারের এই শুনানিতে অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই এবং গুগল ডিপমাইন্ডের সাবেক কর্মীরা নিউইয়র্কের আইনপ্রণেতাদের সামনে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, এআই প্রযুক্তি এমন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে যে সরকারি নীতিমালা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের এই আলোচনা শুধু প্রযুক্তি কোম্পানি বা সফটওয়্যার শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এআই এখন স্কুল, হাসপাতাল, ব্যাংক, চাকরি, আইনশৃঙ্খলা, সরকারি সেবা, পরিবহন এবং ছোট ব্যবসাসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অংশে প্রবেশ করছে। ফলে প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তার প্রভাব সাধারণ নিউইয়র্কবাসীর ওপরও পড়তে পারে।
শুনানিতে সাবেক অ্যানথ্রপিক প্রকৌশলী জ্যাকব কক্সন প্রযুক্তি শিল্পের দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা তৈরি করার ক্ষেত্রে শুধু দ্রুত উদ্ভাবন করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; একই সঙ্গে এসব প্রযুক্তি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং সম্ভাব্য ক্ষতি কীভাবে ঠেকানো হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি বড় উদ্বেগ হলো, অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে কি না। এ ধরনের আশঙ্কা এখনও ভবিষ্যৎকেন্দ্রিক হলেও এআই গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে এটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
এআই প্রযুক্তির বর্তমান ব্যবহার অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। চিকিৎসা গবেষণা, রোগ শনাক্তকরণ, ভাষা অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ, শিক্ষা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক কাজের ক্ষেত্রে এআই মানুষের সময় ও খরচ কমাতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে নতুন ধরনের চাকরি ও ব্যবসার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু একই প্রযুক্তি ভুল তথ্য তৈরি, প্রতারণা, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, সাইবার হামলা এবং পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্তের মতো সমস্যাও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মানুষ যখন এআইয়ের তৈরি তথ্যকে সত্য ধরে নেয়, তখন ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল তাই এআই ব্যবহারে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত এআই সরঞ্জাম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং এআই ব্যবস্থার অনিয়ম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশকারী কর্মীদের সুরক্ষা।
তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা পরীক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো কোম্পানি নিজের তৈরি এআই ব্যবস্থাকে নিজেই পরীক্ষা করলে কিছু দুর্বলতা শনাক্ত না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করানো হলে প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে আরও নিরপেক্ষ ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সিটি কাউন্সিলের আলোচনায় এআই কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু প্রতিনিধি স্থানীয় সরকারের সঙ্গে এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে আইনপ্রণেতারা জানতে চেয়েছেন, সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপদের ঝুঁকি কীভাবে পরিমাপ করা হবে এবং কোনো কোম্পানি তার প্রযুক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য না দিলে সরকার কী করবে।
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। কারণ এআই প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, কয়েক মাস পর সেটিই হয়তো লাখ লাখ মানুষের ব্যবহারের অংশ হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে শুধু নিউইয়র্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য নিজেদের মতো করে এআই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে স্থানীয় সরকার ও অঙ্গরাজ্যের আইন একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য আলাদা আলাদা নিয়ম মেনে চলা কঠিন হতে পারে।
ফেডারেল পর্যায়েও এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বর্তমান প্রশাসন প্রযুক্তি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে শুনানিতে সমালোচনা উঠে এসেছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকারগুলোর যুক্তি হলো, একটি শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়েও কিছু নিয়ম প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি সেবা, শিক্ষা, পুলিশিং ও নাগরিক তথ্য ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের জানার অধিকার থাকা উচিত বলে অনেকে মনে করছেন।
নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকানদের জন্যও এআইয়ের এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্ক সিটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষ বসবাস করেন এবং বিদেশে জন্মগ্রহণকারীরা শহরের কর্মশক্তির প্রায় ৪৩ শতাংশ। বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীও শহরের সবচেয়ে বড় বিদেশি-জন্মগ্রহণকারী জনগোষ্ঠীগুলোর তালিকায় সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।
এআইয়ের বিস্তার বাংলাদেশি কমিউনিটির চাকরির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন, বিপণন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অফিস প্রশাসনের মতো অনেক কাজে এআই ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কিছু কাজের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে, আবার নতুন দক্ষতার চাহিদাও বাড়তে পারে।