গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি বাড়ছে, অথচ এফবিআইয়ের পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটে বড় সংকট

চীন, রাশিয়া ও ইরান থেকে গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকি বাড়লেও এফবিআইয়ের পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটে জনবল কমছে, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি বাড়ছে, অথচ এফবিআইয়ের পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটে বড় সংকট

গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি বাড়ছে, অথচ এফবিআইয়ের পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটে বড় সংকট


যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি ও গোপন তথ্য চুরির হুমকি বাড়লেও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটগুলোতে বড় ধরনের জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে এফবিআইয়ের অনেক মাঠ কার্যালয়ে বিদেশি গুপ্তচর শনাক্ত ও প্রতিরোধে কাজ করা বিশেষ ইউনিটগুলোর অর্ধেকের কাছাকাছি পদ খালি রয়েছে।

এফবিআইয়ের পাল্টা গোয়েন্দা বা কাউন্টারইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মূল কাজ হলো বিদেশি সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি, সরকারি গোপন তথ্য, গবেষণা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য বিদেশি শক্তির হাতে চলে যাওয়া ঠেকানোও এই ইউনিটগুলোর অন্যতম দায়িত্ব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে চীন, রাশিয়া ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে এসব দেশের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি, সাইবার হামলা, প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং গোপন তথ্য চুরির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।

কিন্তু একই সময়ে এফবিআইয়ের পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটে কর্মীসংখ্যা কমে যাওয়ায় তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করা কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এনপিআর জানিয়েছে, এফবিআইয়ের ৫৬টি মাঠ কার্যালয়ের অনেকগুলোতেই পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটে অনুমোদিত পদের মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পূরণ হয়েছে। কিছু কার্যালয়ে বিদেশি গুপ্তচরবিরোধী ইউনিটের সংখ্যা অর্ধেক পর্যন্ত কমে গেছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে এফবিআইয়ের বর্তমান নেতৃত্বের অগ্রাধিকারের পরিবর্তনকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিচালক কাশ প্যাটেলের নেতৃত্বে এফবিআই সহিংস অপরাধ, অভিবাসন এবং অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে কিছু কর্মকর্তা ও বিশ্লেষককে পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম থেকে সরিয়ে অন্য দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এফবিআইয়ের মোট জনবল কমে যাচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং বিভিন্ন বিভাগে কর্মীদের দায়িত্ব পরিবর্তন, পুনর্বিন্যাস এবং কিছু ক্ষেত্রে চাকরি ছাড়ার কারণে পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটগুলোতে নির্দিষ্ট জনবল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এফবিআইয়ে বর্তমানে ৩৭ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ বিশেষ এজেন্ট এবং প্রায় ২০ হাজার ১০০ পেশাদার কর্মী রয়েছেন। এসব কর্মী গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, ভাষা, নজরদারি, প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, আর্থিক বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।

এফবিআই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ৫৫টি মাঠ কার্যালয় এবং শত শত আঞ্চলিক ও স্থানীয় অফিসের মাধ্যমে কাজ করে। ফলে কোনো একটি বিভাগের কর্মী পুনর্বিন্যাসের প্রভাব পুরো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একইভাবে পড়ে না। তবে পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর প্রয়োজন হওয়ায় জনবল ঘাটতি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

একজন সাধারণ অপরাধ তদন্তকারীকে দ্রুত একটি স্থানীয় অপরাধের তদন্তে পাঠানো সম্ভব হলেও বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির তদন্ত অনেক বেশি জটিল। এতে বিদেশি সরকার, গোপন যোগাযোগ, প্রযুক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন, সাইবার কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার আগেই এর লক্ষণ শনাক্ত করতে হয়। কোনো গবেষক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা বা সামরিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বিদেশি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হতে পারে।

এ কারণে পাল্টা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে অন্য দায়িত্বে সরিয়ে দিলে নতুন কর্মীকে একই পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করতে সময় লাগে।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে একাধিক মামলা করেছে। এফবিআইয়ের নিজস্ব প্রকাশিত তথ্যেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদেশি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তি পাচার, গোপন তথ্য সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার কর্মকাণ্ডের তদন্তের কথা উল্লেখ রয়েছে।

আগস্টে মার্কিন বিচার বিভাগ ও এফবিআই চীন-সমর্থিত হ্যাকারদের পরিচালিত কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম জব্দ করার কথা জানিয়েছিল। এসব প্ল্যাটফর্ম যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে সাইবার হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি ও সাইবার হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাল্টা গোয়েন্দা ইউনিটে অভিজ্ঞ ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে তদন্ত ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর