ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদে ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাগিকে মনোনয়ন পেজেশকিয়ানের

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা শিল্প কর্মকর্তা মেহরদাদ আখলাগি কেতাবচিকে মনোনয়ন দিয়েছেন, এখন সংসদের আস্থাভোটের অপেক্ষা চলছে।

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদে ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাগিকে মনোনয়ন পেজেশকিয়ানের

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদে ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাগিকে মনোনয়ন পেজেশকিয়ানের


ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মেহরদাদ আখলাগি কেতাবচির নাম সংসদে পাঠিয়েছেন। ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এই মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে এখনো তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হননি। ইরানের সংসদে তার কর্মপরিকল্পনা ও যোগ্যতা পর্যালোচনার পর আস্থাভোটে অনুমোদন পেলে তবেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও দেশটির অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও মনোনয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। 

মেহরদাদ আখলাগি কেতাবচি ইরানের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্প কাঠামোর একজন দীর্ঘদিনের কর্মকর্তা। তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বিশেষ করে ইরানের মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে তার দায়িত্ব পালনের ইতিহাস রয়েছে। ২০১৪ সালে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হোসেইন দেহকানের সিদ্ধান্তে তাকে ইরানের মহাকাশ শিল্প সংস্থার প্রধান করা হয়েছিল। ওই পদে তিনি পূর্ববর্তী প্রধান সাইয়্যেদ মেহদি ফারাহির স্থলাভিষিক্ত হন। 

তার নাম অবশ্য ইরানের সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে ২০০৮ সালে তাকে শহীদ বাকেরি শিল্পগোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই নথিতে তাকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সময়ে তার নাম জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞার তালিকাতেও যুক্ত হয়েছিল। 

পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত নথিতেও মেহরদাদ আখলাগি কেতাবচির নাম পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের ইউরোপীয় নথিতে তাকে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থা এবং মহাকাশ শিল্প সংস্থার পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সামরিক উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। একই নথিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন বিমান ও রাডার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। 

এ কারণে পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক মনোনয়নকে শুধু প্রশাসনিক নিয়োগ হিসেবে দেখছেন না অনেক পর্যবেক্ষক। ইরান বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ শিল্পের অভিজ্ঞ একজন কর্মকর্তাকে বেছে নেওয়া সরকারের প্রতিরক্ষা উৎপাদন, সামরিক প্রযুক্তি এবং অস্ত্র সক্ষমতার ওপর গুরুত্বের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এই মনোনয়নের রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরকারিভাবে কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা এখনো দেওয়া হয়নি। 

মেহরদাদ আখলাগির মনোনয়ন এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী মন্ত্রী ছাড়া পরিচালিত হচ্ছিল। ইরানের সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। পেজেশকিয়ানের নতুন মনোনয়ন সেই শূন্যতা পূরণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে। 

ইরানের সংবিধানের ১৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মন্ত্রী পদে প্রার্থী সংসদে উপস্থাপন করতে পারেন এবং সংসদের আস্থাভোটের মাধ্যমে ওই প্রার্থীকে অনুমোদন দেওয়া হয়। মেহরদাদ আখলাগির ক্ষেত্রেও একই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রথমে সংসদের সংশ্লিষ্ট কমিটিতে তার কর্মপরিকল্পনা ও পেশাগত যোগ্যতা পর্যালোচনা হবে। এরপর সংসদের পূর্ণ অধিবেশনে আস্থাভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। 

ইরানের অভ্যন্তরীণ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আখলাগিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাকাশ শিল্প সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিচয়গুলোর একটি। এই প্রতিষ্ঠান ইরানের সামরিক মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে তার সম্ভাব্য নিয়োগ ইরানের সামরিক শিল্প ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে। 

তবে তার মনোনয়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আগ্রহের কারণ রয়েছে। আখলাগির নাম অতীতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নথিতে তার নাম এবং ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে তার দায়িত্বের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। ফলে সংসদে তার মনোনয়ন অনুমোদিত হলে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক প্রযুক্তি এবং অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা তৈরি হতে পারে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর