সৌদি আরবের দুই বিমানবন্দরে হামলা, আহত তিনজন; বাড়ছে ইয়েমেন উত্তেজনা

সৌদি আরবের জাজান ও নাজরান বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন সামান্য আহত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থাপনা, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা।

সৌদি আরবের দুই বিমানবন্দরে হামলা, আহত তিনজন; বাড়ছে ইয়েমেন উত্তেজনা

সৌদি আরবের দুই বিমানবন্দরে হামলা, আহত তিনজন; বাড়ছে ইয়েমেন উত্তেজনা


সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জাজান ও নাজরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোমবার সন্ধ্যায় পৃথক হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় তিনজন সামান্য আহত হয়েছেন এবং বিমানবন্দরের কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। 

সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাজানের কিং আবদুল্লাহ বিন আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং নাজরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্থাপনাকে লক্ষ্য করে দুটি হামলা চালানো হয়। হামলার পর জরুরি উদ্ধারকারী দল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। বিমান চলাচল ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনাও শুরু হয়েছে। 

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বলেছে, হামলায় আহত তিনজনের আঘাত গুরুতর নয়। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যাত্রী ও বিমানবন্দরকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে হামলার ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র কিংবা হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। 

ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, বিমানবন্দর দুটিতে হামলার খবরটি গুজব নয়। সৌদি সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি হামলা এবং তিনজন আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে একই তথ্য প্রকাশ করেছে। ফলে ‘দুই বিমানবন্দরে হামলা ও তিনজন আহত’ এই মূল দাবিটি সত্য বলে নিশ্চিত করা যাচ্ছে। 

তবে হামলাকারী হিসেবে ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর নাম সরাসরি সৌদি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন কোনো বক্তব্য যে হুথিরাই নিশ্চিতভাবে এই দুটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে তা আলাদাভাবে সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

তবে একই দিনে ইয়েমেনের হুথি বাহিনী সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাদের অভিযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করা হয়েছে। তার বক্তব্যে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাবিগে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা, আবহা বিমানবন্দর, খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটি এবং জাজান ও নাজরানের কয়েকটি স্থানের কথা বলা হয়। 

হুথি বাহিনী আরও দাবি করেছে, ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সামরিক অগ্রযাত্রা এবং সৌদি বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে। তবে তাদের দাবি করা হামলাগুলোর সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। রয়টার্সও উল্লেখ করেছে, হুথিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবির সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। 

হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের এলাকায় হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি বাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা শহরের দিকে অগ্রসর হয়েছে এবং হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি এলাকা পুনর্দখলের চেষ্টা করছে। 

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হুথি বাহিনী সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করার দাবি করেছে। বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগ ওঠায় পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে জাজান ও নাজরান সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এসব এলাকায় সংঘাতের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সোমবার হুথিদের বিরুদ্ধে দেশটির বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করার অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সৌদি সরকার জানিয়েছে, জাজান, নাজরান, আবহা, খামিস মুশাইতসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনায় তারা দেশের ভূখণ্ড, নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে। 

এর আগে চলতি বছরও জাজানসহ সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনায় হুথি হামলার অভিযোগ উঠেছে। আগস্টে জাজান এলাকায় সৌদি আরামকোর একটি পরিশোধনাগারে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে। হুথিরা সেটিকে নিজেদের হামলার ফল বলে দাবি করলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ আগুনের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি। 

বর্তমান ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি কর্তৃপক্ষ তিনজনের আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করলেও হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। একইভাবে বিমানবন্দর দুটির নিয়মিত বিমান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাবিও সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরিক্ত দাবি যাচাই ছাড়া প্রচার না করাই নিরাপদ।

জাজান ও নাজরান বিমানবন্দরে হামলা এবং তিনজন আহত হওয়ার খবরটি সত্য ও সরকারি সূত্রে নিশ্চিত। তবে হামলায় ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং হামলার প্রত্যক্ষ দায় কার সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ হয়নি। হুথিদের পক্ষ থেকে একই সময়ে সৌদি ভূখণ্ডে হামলার দাবি থাকলেও দুই বিমানবন্দরের হামলার সঙ্গে তাদের দায় সরাসরি ও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর