বার্নি স্যান্ডার্সের নাগরিকত্বের পথের আহ্বান, মার্কিন অভিবাসননীতিতে নতুন বিতর্ক
বার্নি স্যান্ডার্স অনিবন্ধিত অভিবাসীদের নাগরিকত্বের পথ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন, তবে প্রস্তাবটি এখনো আইন হয়নি এবং ভোটাধিকার স্বয়ংক্রিয় নয়।
বার্নি স্যান্ডার্সের নাগরিকত্বের পথের আহ্বান, মার্কিন অভিবাসননীতিতে নতুন বিতর্ক
স্যান্ডার্স দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনিবন্ধিত অভিবাসীদের জন্য বৈধ মর্যাদা ও শেষ পর্যন্ত নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। ২০১৯ সালেও তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন সামগ্রিক অভিবাসন সংস্কার এবং দেশটিতে বসবাসরত লাখো অনিবন্ধিত মানুষের জন্য নাগরিকত্বের পথে যাওয়ার সুযোগ। একই বক্তব্যে তিনি সীমান্ত নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছিলেন।
সাম্প্রতিক অবস্থানও সেই দীর্ঘদিনের নীতির ধারাবাহিকতা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে স্যান্ডার্স বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন সামগ্রিক অভিবাসন সংস্কার এবং অনিবন্ধিত মানুষের নাগরিকত্বের পথ। একই সঙ্গে তিনি অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেন। অর্থাৎ তাঁর অবস্থানকে সীমান্ত পুরোপুরি উন্মুক্ত করার আহ্বান হিসেবে দেখানোও অতিরঞ্জিত হবে।
স্যান্ডার্সের বক্তব্যের সময় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসননীতি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অনিবন্ধিত অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে স্যান্ডার্স প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন প্রয়োগনীতির তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি অভিবাসন ও সীমান্তরক্ষী সংস্থার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
এখানেই স্যান্ডার্সের নতুন করে নাগরিকত্বের পথ তৈরির আহ্বান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন সংস্কার নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এক পক্ষ সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ প্রবেশ বন্ধ এবং বহিষ্কারকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। অন্য পক্ষ বলছে, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী, কাজ করা এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখা অনিবন্ধিত ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে বৈধতার সুযোগ থাকা উচিত।
তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন হলো নাগরিকত্বের পথ তৈরি হলেই সংশ্লিষ্ট সবাই সঙ্গে সঙ্গে ভোট দিতে পারবেন, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব একটি আইনগত প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তি আগে বৈধ মর্যাদা পেলেও নাগরিকত্ব অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা, আবেদন, যাচাই এবং অন্যান্য আইনগত ধাপ পূরণ করতে হয়। নাগরিকত্ব পাওয়ার পরই সাধারণভাবে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা তৈরি হয়।
তাই ‘এই প্রস্তাবের ফলে সঙ্গে সঙ্গে লাখো নতুন ভোটার তৈরি হবে’ এমন দাবি বাস্তবতার তুলনায় অতিরঞ্জিত। ভবিষ্যতে আইন পাস হলে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা পর্যায়ক্রমে নাগরিকত্ব অর্জন করলে ভোটারসংখ্যায় প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু সেই প্রভাব তাৎক্ষণিক বা স্বয়ংক্রিয় নয়।
স্যান্ডার্সের অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি নতুন করে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলেননি। তিনি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলছেন। ২০১৮ সালে তিনি তরুণ অভিবাসীদের জন্য নাগরিকত্বের পথ এবং বৃহত্তর অভিবাসন সংস্কারের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিলেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতেও চলতি সময়ে অভিবাসনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় আলোচনায় রয়েছে। আটক অভিবাসীদের জামিন শুনানির সুযোগ এবং বহিষ্কারসংক্রান্ত নীতির মতো বিষয় আদালতের সামনে রয়েছে। ফলে অভিবাসননীতি বর্তমানে শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বড় ধরনের সাংবিধানিক ও আইনি বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
স্যান্ডার্সের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও এখানেই। তিনি এমন সময়ে নাগরিকত্বের পথের কথা বলছেন, যখন ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অভিবাসন প্রয়োগনীতি এগিয়ে নিচ্ছে এবং দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিবাসন অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠেছে। ফলে তাঁর বক্তব্য ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসননীতি নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে আসতে পারে।
সবশেষে বার্নি স্যান্ডার্স সত্যিই অনিবন্ধিত অভিবাসীদের জন্য সামগ্রিক অভিবাসন সংস্কার এবং নাগরিকত্বের পথ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এটি কোনো নতুন আইন নয়, নাগরিকত্ব তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নয়। একইভাবে এসব মানুষ নাগরিকত্ব পাওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার হয়ে যাবেন এমন ধারণাও ভুল। স্যান্ডার্সের বক্তব্য মূলত একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানকে আবারও সামনে এনেছে, আর সেটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।