সৌদি আকাশসীমায় উড়োজাহাজ চলাচলে হুতিদের কঠোর সতর্কবার্তা, বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা
সৌদি আকাশসীমায় বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ে হুতিদের কঠোর সতর্কবার্তায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা শঙ্কা।
সৌদি আকাশসীমায় উড়োজাহাজ চলাচলে হুতিদের কঠোর সতর্কবার্তা, বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা
সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারকারী বেসামরিক উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। সোমবার, ৫ অক্টোবর, হুতিদের নিয়ন্ত্রিত একটি সমন্বয় সংস্থা জানায়, সৌদি আরবের আকাশসীমা তাদের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে এবং সেখানে উড়োজাহাজ চলাচল নিরাপদ নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘সৌদি আরবের সম্পূর্ণ বিমান অবরোধ’ দাবিটি পুরোপুরি সঠিক নয়। এটি সৌদি সরকারের ঘোষিত আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্ত নয়; বরং হুতিদের পক্ষ থেকে দেওয়া সামরিক সতর্কবার্তা।
হুতিদের নিয়ন্ত্রিত মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সৌদি আকাশসীমায় চলাচলকারী সব বেসামরিক উড়োজাহাজ সংস্থাকে সতর্ক করা হয়েছে। হুতি-সমর্থিত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান চলতে থাকলে দেশটির আকাশসীমা নিরাপদ থাকবে না। একই বিবৃতিতে মক্কা ও মদিনার আকাশসীমাকে হুতিদের সামরিক কার্যক্রমের বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সতর্কবার্তা এমন সময় এসেছে যখন সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। হুতিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানে সৌদি আরব বিমান শক্তি ব্যবহার করছে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত আবারও বড় আকারে আঞ্চলিক সামরিক সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি একই সময়ে সৌদি আরবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দাবি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাবিগ এলাকায় সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির একটি স্থাপনা এবং দক্ষিণ সৌদি আরবের আবহা বিমানবন্দর, খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটি ও আরও কয়েকটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছে।
হুতিদের দাবি, রিয়াদের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে চালানো হামলায় বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং রাবিগের একটি তেল স্থাপনায় আগুন লেগেছে। তবে এসব হামলার সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও তাৎক্ষণিকভাবে হুতিদের এসব দাবির বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। তাই হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা বেসামরিক উড়োজাহাজের ওপর সরাসরি কী প্রভাব পড়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তবে সৌদি আকাশপথ নিয়ে ঝুঁকির বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তা সংস্থা গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের আকাশসীমার নির্দিষ্ট অংশ এড়িয়ে চলার জন্য বিমান সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দিয়েছিল। সংস্থাটি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ হামলার বিস্তৃতি এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তার কারণে বেসামরিক উড়োজাহাজের জন্য ঝুঁকি বাড়ার কথা জানিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ইয়েমেনের নতুন করে তীব্র হওয়া যুদ্ধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে হুতিদের অবস্থানের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে ওই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা পুনর্দখলের দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে হুতিরা এসব অগ্রগতির কিছু দাবি অস্বীকার করেছে এবং পাল্টা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ হামলার হুমকি দিয়েছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ইয়েমেনের সংঘাত সেখানে নতুন করে ছড়িয়ে পড়লে শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেন নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হবে।
সৌদি আরবের আকাশপথও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচল অঞ্চল। রিয়াদ, জেদ্দা, মদিনা ও অন্যান্য শহরের বিমানবন্দরগুলো আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র বা চালকবিহীন উড়োজাহাজ হামলার ঝুঁকি বাড়লে বিমান সংস্থাগুলোকে বিকল্প পথ বেছে নিতে হতে পারে। এর ফলে ফ্লাইট বিলম্ব, পথ পরিবর্তন কিংবা কিছু ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ চলাচল স্থগিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় না যে সৌদি আরবের পুরো আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেছে অথবা সব বিমান সংস্থা দেশটির আকাশসীমা ছেড়ে দিয়েছে। বরং নিশ্চিত তথ্য হলো, হুতিদের পক্ষ থেকে সৌদি আকাশসীমাকে অনিরাপদ ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক বেসামরিক উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে সেখানে না ওড়ার সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।