বেথলেহেমের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হানা বাড়িঘরে তল্লাশি উদ্বেগ ছড়িয়েছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে
বেথলেহেমের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালিয়ে বাড়িঘরে তল্লাশি করেছে কোনো আটকের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
বেথলেহেমের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হানা বাড়িঘরে তল্লাশি উদ্বেগ ছড়িয়েছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেম প্রদেশে একযোগে বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর সকালে প্রকাশিত ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেথলেহেম শহরসহ আশপাশের একাধিক শহর, গ্রাম ও এলাকায় সেনারা প্রবেশ করে বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশি চালায়। স্থানীয় নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াফা জানিয়েছে, অভিযানের সময় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী বেথলেহেম শহরের পাশাপাশি বেইত জালা ও বেইত সাহুর শহরেও প্রবেশ করে। একই সময়ে দোহা, আল-খাদর, আরতাস, জাবাল আল-মাওয়ালেহ, হিন্দাজা, রুখমা, জানাতা, হারমালা ও রুফাইদা এলাকায়ও তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। এসব এলাকায় সামরিক বাহিনীর প্রবেশের পর স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেথলেহেম শহরের কয়েকটি বাড়িতে বিশেষভাবে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এর মধ্যে আল-আহমার পরিবারের কয়েকটি বাড়ির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব তল্লাশির সময় কোনো গ্রেপ্তার বা আটকের ঘটনা ঘটেছে এমন তথ্য স্থানীয় নিরাপত্তা সূত্র দেয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরিক্ত কিছু দাবি আপাতত নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীর দেওয়া মূল দাবিটি সত্য। ওয়াফা ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই দিন বেথলেহেম প্রদেশের একাধিক এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রবেশ এবং বাড়িঘরে তল্লাশির কথা জানিয়েছে। স্থানীয় আরেকটি সংবাদমাধ্যমও ওয়াফার প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেথলেহেম, বেইত জালা, বেইত সাহুর এবং আশপাশের কয়েকটি এলাকায় সামরিক অভিযান ও বাড়িতে তল্লাশির তথ্য প্রকাশ করেছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, গ্রেপ্তার, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। এর মাত্র এক দিন আগে, ৫ অক্টোবর, বেথলেহেমের পূর্বাঞ্চলের বেইত তামার গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনী প্রবেশ করে একটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে এক ব্যক্তিকে আটক করেছিল বলে ওয়াফা জানিয়েছিল। ওই ঘটনায় স্থানীয় সূত্র জানায়, বাহিনী আবু হাদিদ মোড় এলাকায় অবস্থান নেয় এবং ওমর আবু জাওরাহর বাড়িতে তল্লাশির পর তাকে আটক করে।
এর আগেও বেথলেহেম প্রদেশে একই ধরনের অভিযান হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়াফা জানিয়েছিল, পশ্চিম বেথলেহেমের হুসান গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনী প্রবেশ করে কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালায়। সেদিন শাকের আবদুল ওয়াহাব হামামরা, ইব্রাহিম হামামরা ও মোহাম্মদ হামামরার বাড়িতে তল্লাশির কথা জানানো হলেও কোনো আটকের খবর পাওয়া যায়নি। একই অভিযানে আল-উবাইদিয়া, বেইত ফাজ্জার ও জা’তারাহ এলাকাতেও বাহিনীর প্রবেশের খবর পাওয়া যায়।
৪ অক্টোবরও বেথলেহেম শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রবেশের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, সেদিন বাহিনী বাব আল-জাকাক এলাকায় এবং জেরুজালেম-হেবরন প্রধান সড়কের অংশে অবস্থান নেয়। কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও তল্লাশি চালানো হয়। তখনও কোনো আটকের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বেথলেহেমে ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতার বিষয়টি বৃহত্তর পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের ২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, বাড়িঘর ধ্বংস এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কারণে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীরে ৭০টি ফিলিস্তিনি মালিকানাধীন স্থাপনা ধ্বংস বা সিল করে দেয়, যার ফলে ৯৩ জন বাস্তুচ্যুত হন।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের সময় ফিলিস্তিনিদের আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একই সময়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় বাড়িঘর, যানবাহন, কৃষিজমি ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ফলে সামরিক অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সম্মিলিত প্রভাব সাধারণ ফিলিস্তিনি জনগণের চলাচল, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবিকার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়ে জুন ২০২৬-এর মহাসচিবের প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিগুলোর কোনো আইনগত বৈধতা নেই নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবেও এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বেথলেহেম প্রদেশকে বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলে বাধার কারণে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেথলেহেম প্রদেশের বিস্তীর্ণ অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। বসতি সম্প্রসারণ এবং চলাচলে প্রতিবন্ধকতার কারণে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও ভূমিতে প্রবেশের সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে মঙ্গলবারের সর্বশেষ অভিযানের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত তথ্য হলো ইসরায়েলি বাহিনী বেথলেহেম প্রদেশের বহু এলাকায় প্রবেশ করেছে এবং কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। অভিযান চলাকালে হতাহত, ব্যাপক ধরপাকড় বা বড় ধরনের সংঘর্ষের যেসব অতিরিক্ত দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেগুলোর স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য নিশ্চিতকরণ পাওয়া না পর্যন্ত সেগুলোকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না। বর্তমান যাচাইয়ে কোনো আটকের তথ্য পাওয়া যায়নি এটাই নিশ্চিতভাবে উল্লেখযোগ্য তথ্য।
বেথলেহেমের সর্বশেষ এই অভিযান তাই পশ্চিম তীরে চলমান উত্তেজনার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বাড়িতে হঠাৎ সামরিক প্রবেশ ও তল্লাশি শুধু নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগই নয়, স্বাভাবিক জীবনযাপন, চলাচল ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হচ্ছে কি না এবং অভিযানের পরবর্তী ধাপে কোনো আটক, সংঘর্ষ বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে কি না, সে বিষয়ে পরবর্তী স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।