হরমুজে ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে অর্থহীন বললেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান

হরমুজে পরপর ট্যাংকারে হামলা, অন্যদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে অর্থহীন বলেছে; তবু কূটনৈতিক যোগাযোগের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে।

হরমুজে ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে অর্থহীন বললেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান

হরমুজে ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে অর্থহীন বললেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান


ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন করে আরও গভীর হয়েছে। একদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে অর্থহীন বলে মন্তব্য করেছেন, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত অস্ত্রের আঘাতের খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী ব্রিটিশ সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক ট্যাংকার অজ্ঞাত নিক্ষেপাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করা হয়নি। 

ইরানি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সোমবার তেহরানে আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কার্যকারিতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান যখনই আলোচনার টেবিলে বসেছে, তার পরেই দেশটির ওপর সামরিক হামলা, হত্যাকাণ্ড, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ এসেছে। তিনি দাবি করেন, আলোচনার পর ইরান তিনবার আক্রান্ত হয়েছে। তাঁর যুক্তি হলো, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে সমাধানের জন্য আলোচনা করছে এমন বিশ্বাস করা কঠিন। 

তবে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। অর্থাৎ সামরিক উত্তেজনা যতই বাড়ুক, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি সম্ভাব্য পথ এখনো খোলা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানও হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও অবরোধ পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তার জবাবও পেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। 

এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ অক্টোবর একটি ট্যাংকার অজ্ঞাত নিক্ষেপাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে আগুন ধরে যায় এবং নাবিকেরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছিলেন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং সমুদ্রে দূষণেরও কোনো প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। 

এর আগের দিনও হরমুজ প্রণালিতে দুটি ট্যাংকার অজ্ঞাত নিক্ষেপাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। একটি ছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসবাহী ট্যাংকার এবং অন্যটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ। ফলে পাঁচ অক্টোবরের ঘটনাটি দুই দিনের মধ্যে তৃতীয় ট্যাংকারে আঘাত হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ কোনো ঘটনাতেই হামলাকারী হিসেবে ইরানের নাম নিশ্চিত করেনি। এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু প্রতিবেদনে হামলাগুলোকে সরাসরি ইরানের হামলা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও দায় নির্ধারণের মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। 

একই সময়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের সময় একটি ট্যাংকারকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সতর্ক করে ফিরে যেতে বলে। জাহাজটির কর্তৃপক্ষ জানায়, নির্দেশ অমান্য করলে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। পরে জাহাজটি পথ পরিবর্তন করে ফিরে যায়। ব্রিটিশ সামুদ্রিক সংস্থার প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে সন্দেহজনক তৎপরতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাটি ইরানি বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানালেও অজ্ঞাত নিক্ষেপাস্ত্রের হামলাগুলোর সঙ্গে ইরানের সরাসরি যোগসূত্র নিশ্চিত করা হয়নি। 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ এই সরু জলপথ ব্যবহার করে। ফলে এখানে কয়েকটি জাহাজে হামলা বা জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচের ওপর চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কারণে ইতোমধ্যে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। 

বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ছয় অক্টোবরের বাজার প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার কারণে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি, নিরাপত্তা ঝুঁকি, দীর্ঘতর পথ এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বাজারকে অস্থির রাখছে। 

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস দ্রুত বাড়ছে। পেজেশকিয়ানের বক্তব্য দেখাচ্ছে, তেহরান সামরিক চাপের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় বসতে অনিচ্ছুক। অন্যদিকে ট্রাম্প সরাসরি আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা বললেও তাঁর প্রশাসনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ধারাবাহিক হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর