ট্রাম্পের মেইলে ভোট সীমিত করার আদেশ কার্যকর হয়নি, আদালতের বাধায় থমকে গেছে
ট্রাম্প মেইলে ভোট সীমিত করতে আদেশ দিলেও আদালতের বাধায় নিয়ম আটকে আছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে চলছে আইনি লড়াই।
ট্রাম্পের মেইলে ভোট সীমিত করার আদেশ কার্যকর হয়নি, আদালতের বাধায় থমকে গেছে
যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে ভোটের নিয়ম কঠোর করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশকে ঘিরে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিতে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প সারা দেশে ডাকযোগে ভোট সীমিত করার আদেশে স্বাক্ষর করেছেন এবং এটি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই কার্যকর হবে। তবে তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, দাবিটির একটি অংশ সত্য হলেও পুরো বক্তব্যটি সঠিক নয়। ট্রাম্প সত্যিই ডাকযোগে ভোটের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আনার লক্ষ্যে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, কিন্তু সেই আদেশের ভিত্তিতে তৈরি গুরুত্বপূর্ণ ডাক বিভাগের নতুন নিয়ম বর্তমানে আদালতের বাধার মুখে রয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সারা দেশে ডাকযোগে ভোট বন্ধ বা হঠাৎ সীমিত হয়ে যাচ্ছে, এমন দাবি সঠিক নয়।
ট্রাম্প ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ নির্বাচনে নাগরিকত্ব যাচাই এবং ভোটের নিয়ম আরও কঠোর করার উদ্দেশ্যে নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এই আদেশের একটি বড় অংশ ছিল ডাকযোগে এবং অনুপস্থিত ভোটের ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোর মধ্যে আনা। আদেশে ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠানো ভোটপত্রের খামে নির্দিষ্ট চিহ্ন ও শনাক্তকারী ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে ডাক বিভাগের মাধ্যমে ভোটপত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভোটার তালিকা ব্যবহারের জন্য নতুন নিয়ম তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদেশে আরও বলা হয়, প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের জন্য নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়া ভোটারদের একটি তালিকা তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ, সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসন এবং অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডারের তথ্য ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, ফেডারেল নির্বাচনে কেবল যোগ্য নাগরিকদের ভোট নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানো।
তবে এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির সঙ্গে বাস্তবতার বড় পার্থক্য রয়েছে। নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করা এবং সেই আদেশের অধীনে কোনো নতুন নিয়ম বাস্তবে কার্যকর হয়ে যাওয়া একই বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। ডাকযোগে ভোটের পদ্ধতিও অঙ্গরাজ্যভেদে আলাদা। তাই প্রেসিডেন্টের একটি নির্বাহী আদেশ দিয়ে রাতারাতি পুরো দেশের সব ডাকযোগে ভোট বন্ধ করে দেওয়া যায় কি না, সেটি নিয়ে শুরু থেকেই বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন দেখা দেয়।
এই বিষয়টি দ্রুত আদালতে গড়ায়। ফেডারেল আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের ডাকযোগে ভোটসংক্রান্ত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়নে বাধা দেয়। পরে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত যায়। ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়ে নির্বাহী আদেশের কিছু অংশ বাস্তবায়নের পথ সাময়িকভাবে খুলে দেয়। তবে সেই সিদ্ধান্তকে পুরো ডাকযোগে ভোট ব্যবস্থা চালুর অনুমতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ ডাক বিভাগের নির্দিষ্ট নতুন নিয়ম নিয়ে আলাদা আইনি বাধা তখনও বহাল ছিল।
এরপর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। নিম্ন আদালত ডাক বিভাগের নতুন ভোটপত্র সংক্রান্ত নিয়ম কার্যকর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। পরে সর্বোচ্চ আদালতও ট্রাম্প প্রশাসনের সেই নিয়ম অবিলম্বে কার্যকর করার প্রচেষ্টাকে অনুমোদন দেয়নি। ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ডাক বিভাগের নতুন কঠোর নিয়ম কার্যকর করার পরিকল্পনা আটকে যায়।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রকাশিত আদালতসংক্রান্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়, সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে ডাক বিভাগের নতুন নিয়ম কার্যকর করার ওপর নিচের আদালতের বাধা বহাল থাকে। এর অর্থ হলো, অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ডাকযোগে ভোট পরিচালনা করতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘সারা দেশে ডাকযোগে ভোট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে’ ধরনের বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরে।
এদিকে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডাক বিভাগ নিজেই ভোটপত্র দ্রুত ও নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে ডাক বিভাগ জানায়, নির্বাচনের সময় ডাকঘরের কার্যক্রম বাড়ানো, ভোটপত্রের জন্য আলাদা ব্যবস্থা, দ্রুত পরিবহন এবং অতিরিক্ত সংগ্রহের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগের সময়টিতে ভোটপত্র দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে বর্তমান বাস্তবতা হলো, ডাকযোগে ভোট এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি বৈধ পদ্ধতি হিসেবে বহাল রয়েছে। তবে অঙ্গরাজ্যভেদে নিয়ম আলাদা। কোথাও সব ভোটার ডাকযোগে ভোটের সুযোগ পেতে পারেন, কোথাও নির্দিষ্ট কারণ দেখাতে হয়, আবার কোথাও ভোটপত্র পাওয়ার জন্য আলাদা আবেদন করতে হয়। তাই কোনো জাতীয় ঘোষণা দেখে একজন ভোটারের নিজের অঙ্গরাজ্যের নিয়ম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনে নাগরিকত্ব ও ভোটার যোগ্যতা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রেসিডেন্টের মার্চের আদেশে নাগরিকত্ব যাচাই, ভোটার তালিকার তথ্য সমন্বয় এবং ডাকযোগে ভোটের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন বলছে, এসব পদক্ষেপ নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে এবং ভোট ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে প্রয়োজন।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, ফেডারেল সরকারের মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ভোটাধিকার সংগঠন আদালতে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। তাদের যুক্তি, নির্বাচনের পরিচালনায় অঙ্গরাজ্যগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষমতা রয়েছে এবং ফেডারেল প্রশাসন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেই ক্ষমতার বড় অংশ বদলে দিতে পারে না। আদালতে চলমান মামলাগুলোর একটি বড় প্রশ্নও হলো, প্রেসিডেন্ট কতটা নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারেন
এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেভ আমেরিকা আইন নিয়েও রাজনৈতিক সংঘাত। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসকে এই আইন পাস করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। প্রস্তাবিত আইনে ফেডারেল নির্বাচনে ভোটার নিবন্ধনের সময় নাগরিকত্বের প্রমাণ এবং ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রসংক্রান্ত কঠোর নিয়ম আনার কথা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি পাস হলেও আইনটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন।
সিনেটের নথিতেও দেখা যায়, সেভ আমেরিকা আইন নিয়ে মার্চ মাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোট হয়েছে। একটি ভোটে প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য এগিয়ে নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ভোটের অভাবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া বাধার মুখে পড়ে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা ‘সাময়িকভাবে নির্বাহী আদেশ, যতক্ষণ না সেভ আমেরিকা আইন পাস হচ্ছে’—এই বক্তব্যকে সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। নির্বাহী আদেশটি সেভ আমেরিকা আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর থাকবে—এমন কোনো সরল সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ নিজে ডাকযোগে ভোটের সব পদ্ধতি একদিনে বাতিল করেনি। বরং এর মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে নতুন নিয়ম তৈরি, নাগরিকত্ব যাচাই এবং ডাকযোগে ভোটের ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নতুন বিধি তৈরির প্রয়োজন ছিল। এসব বিধির কিছু অংশ আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার পর বাস্তবায়ন আটকে যায়।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বর মাসে। প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশের আসনে ভোট হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক হওয়ায় ভোটের নিয়ম নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের কোনো ঘোষণা থাকলেও প্রত্যেক ভোটারকে নিজের অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
সুতরাং প্রচারিত দাবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্ট যাচাই হলো, ট্রাম্প সত্যিই ডাকযোগে ভোটের নিয়ম কঠোর করার জন্য নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু ‘সারা দেশে ডাকযোগে ভোট নিষিদ্ধ হয়ে গেছে’ বা ‘নতুন নিয়ম মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিশ্চিতভাবেই কার্যকর হবে’ এই দুটি দাবি বর্তমানে সঠিক নয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কারণে ডাক বিভাগের নতুন বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি এখনো আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির সবচেয়ে সঠিক বর্ণনা হবে—ট্রাম্প ডাকযোগে ভোটের নিয়ম কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এ বিষয়ে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, কিন্তু সেই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আদালতের বাধার কারণে বর্তমানে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তাই এটিকে ‘সারা দেশে ডাকযোগে ভোট বন্ধের চূড়ান্ত আদেশ’ হিসেবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর।