রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলা, বাড়ছে উদ্বেগ
জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলার দাবি রাশিয়ার, ক্ষয়ক্ষতি হলেও তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই বলে জানাল কর্তৃপক্ষ।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলা, বাড়ছে উদ্বেগ
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউরোপের সবচেয়ে বড় জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে রাশিয়া। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের প্রধান আলেক্সেই লিখাচভ জানিয়েছেন, হামলায় কেন্দ্রটির দুটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তার দাবি, এতে পারমাণবিক নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার রাতের হামলায় একটি পরীক্ষাগার ভবন এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রোসাটমের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাগার ভবনটি কেন্দ্রটির চতুর্থ ও পঞ্চম চুল্লি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে অবস্থিত। দুই স্থাপনার ছাদে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
রোসাটমের প্রধান লিখাচভ আরও জানিয়েছেন, হামলার সময় কেন্দ্রের কর্মীদের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া একটি গাড়ির চালক নিহত হন। তবে পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান সরঞ্জাম নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে এবং কর্মীরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
রাশিয়া জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামতের জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাছে বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিরাপদ পরিবেশে মেরামতের কাজ চালাতে একটি সাময়িক স্থানীয় যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন হতে পারে বলেও রোসাটম জানিয়েছে।
তবে ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে কেন্দ্রের বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইএইএ জানিয়েছে, ১৯, ২০ ও ২৭ সেপ্টেম্বর কাছাকাছি জাপোরিঝঝিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলায় কয়েকটি ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব সরঞ্জাম পারমাণবিক কেন্দ্রটিতে বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না। কিন্তু ছয়টি পারমাণবিক চুল্লি এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ঠান্ডা রাখার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বাইরের বিদ্যুৎ সংযোগে সমস্যা হলে কেন্দ্রকে জরুরি ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণেই কেন্দ্রটির বাইরের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলাকে পারমাণবিক নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে আইএইএ।
আইএইএ মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক কেন্দ্র ও এর বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আশপাশে সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা জরুরি। সংস্থাটি জানিয়েছে, কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর সাম্প্রতিক হামলাগুলো নতুন করে চাপ তৈরি করছে এবং মেরামতের জন্য স্থানীয় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে পারমাণবিক কেন্দ্রটির আশপাশে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো অস্বাভাবিকতার খবর পাওয়া যায়নি। ইউক্রেনের পারমাণবিক সংস্থা এনারগোঅ্যাটমের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যেও জাপোরিঝঝিয়া কেন্দ্রের এলাকায় বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রের তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব ধরনের তথ্য সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে না বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রটি ২০২২ সালের মার্চ থেকে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ছয়টি চুল্লি নিয়ে এটি ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কেন্দ্রটি বারবার সামরিক কর্মকাণ্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে এবং মস্কো ও কিয়েভ একে অপরকে কেন্দ্রটির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার জন্য দায়ী করে আসছে।
এ ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দায় নির্ধারণ। রাশিয়া দাবি করছে, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলাতেই স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন এ ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। অতীতে একই ধরনের রুশ অভিযোগ ইউক্রেন অস্বীকার করেছে এবং কেন্দ্রের ওপর হামলার দায় নেয়নি। তাই বর্তমান হামলার ক্ষেত্রে কারা ড্রোন ব্যবহার করেছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।