ট্রাম্পের অনুমোদনে ফোর্ট হুডের হত্যাকারী নিডাল হাসানের গুলি করে মৃত্যুদণ্ডের পথ চূড়ান্ত

ফোর্ট হুড হামলায় ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত নিডাল হাসানের মৃত্যুদণ্ডে এবার গুলি করে শাস্তি দেওয়ার অনুমোদন দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

ট্রাম্পের অনুমোদনে ফোর্ট হুডের হত্যাকারী নিডাল হাসানের গুলি করে মৃত্যুদণ্ডের পথ চূড়ান্ত

ট্রাম্পের অনুমোদনে ফোর্ট হুডের হত্যাকারী নিডাল হাসানের গুলি করে মৃত্যুদণ্ডের পথ চূড়ান্ত


যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ২০০৯ সালের ভয়াবহ হামলায় ১৩ জনকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিডাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুমোদন দিয়েছেন। সামরিক কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় বলা হয়েছে, এবার হাসানের মৃত্যুদণ্ড গুলি করে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ছয় দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে আবার কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। 


দাবিটি যাচাই করে দেখা গেছে, মূল খবরটি সত্য। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল ৫ অক্টোবর ২০২৬ ঘোষণা করেন যে যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ নিডাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড গুলি করে কার্যকর করার সুপারিশ করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে অনুমোদন দিয়েছেন। ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর সচিব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ও স্থান নির্ধারণ করবেন। 


হেগসেথের পক্ষ থেকেও সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া এসেছে। তিনি এক শব্দে বলেছেন, “ন্যায়বিচার”। পেন্টাগনের ঘোষণায় হাসানকে ২০০৯ সালের হামলার জন্য দণ্ডিত সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ঘোষণায় বলা হয়েছে, হামলার সময় তিনি ধর্মীয় স্লোগান দিতে দিতে গুলি চালিয়েছিলেন। 


তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বক্তব্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে “গুলি করে মৃত্যুদণ্ডে কোনোভাবেই ভুল হওয়ার সুযোগ নেই” ধরনের দাবি নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। কোনো মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতিই শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত বলে বৈজ্ঞানিক বা সরকারি নিশ্চয়তা নেই। গুলি করে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আইন, চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ এবং সামরিক বিধি অনুসরণ করতে হয়।


নিডাল হাসান ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুডের সৈনিক প্রস্তুতি কেন্দ্রে হামলা চালান। তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হামলায় ১৩ জন নিহত হন এবং ৩২ জনকে হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগে পরে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সেনাবাহিনীর সরকারি নথিতেও এই সংখ্যা এবং মামলার রায় নিশ্চিত করা হয়েছে। 


হামলার পর ঘটনাস্থলে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাসানকে গুলি করে আহত করেন। তিনি বেঁচে গেলেও গুরুতরভাবে আহত হন এবং পরে হুইলচেয়ারে চলাচল করতে থাকেন। তার বিরুদ্ধে সামরিক আইনের অধীনে মামলা হয়। প্রথমে তার বিরুদ্ধে ১৩টি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয় এবং পরে ৩২টি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার অভিযোগ যুক্ত করা হয়। 


২০১৩ সালে শুরু হওয়া সামরিক বিচার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিচার। হাসান নিজের পক্ষে নিজেই আদালতে বক্তব্য রাখেন। বিচার শুরুর সময় তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বরের হামলায় তিনিই গুলি চালিয়েছিলেন। আদালতের কার্যক্রমে তিনি নিজের পক্ষে শক্ত কোনো প্রতিরক্ষা উপস্থাপন করেননি। 


২০১৩ সালের আগস্টে সামরিক আদালত তাকে ১৩টি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। একই সঙ্গে ৩২টি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার অভিযোগেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারিক প্যানেল পরে সর্বসম্মতভাবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার বেতন ও অন্যান্য সামরিক সুবিধাও বাতিল এবং সেনাবাহিনী থেকে তাকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত হয়। 


মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পরও হাসানের সাজা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা সম্ভব ছিল না। সামরিক মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক আপিল ও আইনি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আইনে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সেনাবাহিনীর নিজস্ব আইনবিষয়ক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই হেগসেথ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমোদন চেয়েছিলেন। 


এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই হেগসেথ বলেছিলেন, তিনি হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেছিলেন, ২০০৯ সালের ফোর্ট হুড হামলার শিকার ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়া উচিত। 


এরপর ২০২৬ সালের শুরুতে সেনাবাহিনী সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সম্ভাবনা নিয়ে প্রস্তুতিও জোরদার করে। সেনাবাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছিল “অপারেশন রেজল্যুট জাস্টিস”। এতে সামরিক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের কারাগার থেকে সরিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। জুন মাসে সেনাবাহিনী তখনও বলেছিল যে প্রেসিডেন্টের নির্দিষ্ট অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে। 


এই পরিকল্পনার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সর্বশেষ ১৯৬১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল। ওই বছর সেনাবাহিনীর সৈনিক জন বেনেটকে ফোর্ট লিভেনওয়ার্থে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেনি। 


ফলে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে এটি শুধু একটি পুরোনো মামলার সমাপ্তি হবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিচারব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হবে। কারণ ১৯৬১ সালের পর এটিই হবে প্রথম সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেখানে গুলি করে মৃত্যুদণ্ডসহ অতিরিক্ত কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়। এর ফলে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, দেশটির বৃহত্তর মৃত্যুদণ্ড নীতিতেও আবার আলোচনায় আসে। 


তবে হাসানের ক্ষেত্রে এখনই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে এমন দাবি ভুল। বর্তমানে যা হয়েছে তা হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন এবং গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দিষ্ট তারিখ ও স্থান এখনো সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। 


ফোর্ট হুড হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হিসেবে ইতিহাসে রয়েছে। হামলার পর নিহতদের পরিবার, আহত সেনাসদস্য এবং হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই চলেছে। ২০১৩ সালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পরও এক দশকের বেশি সময় ধরে হাসান কারাগারে ছিলেন।


বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়াকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে সামরিক ও বিচারিক ব্যবস্থার নির্ধারিত সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়া জরুরি। সেনাবাহিনীর আইনবিষয়ক নথিতেও বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের মামলায় আপিল ও পরবর্তী আইনি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর