হুথিদের হামলায় উত্তপ্ত সৌদি আরব, ইরানের বিরুদ্ধে মামলা করার খবরের সত্যতা যা জানা গেল

সৌদি আরবের পাঁচ অক্টোবরের সরকারি বিবৃতিতে হুথিদের হামলার নিন্দা এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

হুথিদের হামলায় উত্তপ্ত সৌদি আরব, ইরানের বিরুদ্ধে মামলা করার খবরের সত্যতা যা জানা গেল

হুথিদের হামলায় উত্তপ্ত সৌদি আরব, ইরানের বিরুদ্ধে মামলা করার খবরের সত্যতা যা জানা গেল


সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ সংঘাত শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, অর্থনৈতিক স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ হামলার অভিযোগের মধ্যে পরিস্থিতি দ্রুত আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। একই সময়ে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, হুথিদের উন্নত অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহায়তা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। কিন্তু তথ্য যাচাই করে এখন পর্যন্ত এমন কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা বা আবেদন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি। আদালতের সাম্প্রতিক প্রকাশিত মামলার তালিকাতেও সৌদি আরব বনাম ইরান নামে হুথিদের অস্ত্র সহায়তার অভিযোগে নতুন কোনো মামলা দেখা যাচ্ছে না।


অর্থাৎ সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন খবরকে এই মুহূর্তে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বলা যাচ্ছে না। এটি আপাতত একটি অপ্রমাণিত দাবি।


তবে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ও তদন্ত রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন তদন্তে হুথিদের হাতে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন উড়োজাহাজ এবং এসব অস্ত্রের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে ইরানে তৈরি অস্ত্র ও প্রযুক্তির মিল পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশটির বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের বৈধ সরকারকে উৎখাত করে তারা বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর সৌদি আরব ইয়েমেনের সরকারের পক্ষে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি থাকলেও চলতি বছরে আবার বড় ধরনের লড়াই শুরু হয়েছে।


সাম্প্রতিক সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের এলাকা। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথগুলোর একটি হওয়ায় এই অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।


সোমবার সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে হুথিদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখলের দাবি করেছে। সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় সরকারি বাহিনী মোখা শহরের দিকে অগ্রসর হয়েছে এবং ধুবাব এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখলের কথাও জানিয়েছে। তবে এসব সামরিক সাফল্যের সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হুথিরা সরকারি বাহিনীর দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।


এর আগে ইয়েমেনের সরকারি পক্ষ জানিয়েছিল, হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকা পুনর্দখলের জন্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে। সৌদি আরব এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ইয়েমেন সংঘাত আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


এদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, হুথিরা দেশটির বিভিন্ন বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রিয়াদসহ দেশের বিভিন্ন শহর, মক্কা ও মদিনা এবং দক্ষিণ লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব এলাকায় সৌদি জাহাজের ওপর হামলার অভিযোগ করেছে।


সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিজেদের ভূখণ্ড, নাগরিক, সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে। একই সঙ্গে তারা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।


অন্যদিকে হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ হামলা চালানোর দাবি করেছে। পাঁচ অক্টোবর হুথিদের পক্ষ থেকে রিয়াদ ও খুরাইস এলাকার সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করা হয়। এই দাবির পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে।


তবে প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে হুথিদের দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কোনো স্থাপনায় আগুন লাগা বা বিস্ফোরণ ঘটলেই সেটিকে নিশ্চিতভাবে হুথিদের হামলার ফল বলা যাচ্ছে না। একইভাবে কোনো হামলায় ইরানের সরাসরি নির্দেশ বা সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণও আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়।


ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্কের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং কয়েকটি পশ্চিমা দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইরান হুথিদের অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করে। ইরান সাধারণত হুথিদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা তাদের হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।


জাতিসংঘের বিভিন্ন তদন্তে হুথিদের ব্যবহৃত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের সঙ্গে ইরানি অস্ত্রের মিল পাওয়ার কথা উঠে এসেছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট হামলার ক্ষেত্রে ইরানের সরকার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।


এ কারণেই সৌদি আরব আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করতে যাচ্ছে—এই দাবির সঙ্গে বাস্তব ঘটনার পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। হুথিদের হামলা এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সামরিক সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু অভিযোগ ও তদন্ত থাকলেও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে নতুন মামলা দায়েরের নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।


আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা গ্রহণ করে না। আদালতের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি প্রয়োজন। ফলে সৌদি আরব ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে চাইলে তাকে অভিযোগের পাশাপাশি আদালতের এখতিয়ারের আইনি ভিত্তিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।


বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নিশ্চিত ঘটনা হলো, ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সৌদি আরব হুথিদের হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে এবং পাল্টা সামরিক অভিযানকে সমর্থন করছে। হুথিরাও সৌদি ভূখণ্ডে হামলার দাবি অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে সামরিক সংঘাত আরও বাড়ছে।


এই সংঘাত শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দাব দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। সেখানে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়লে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।


বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে তাই সবচেয়ে নির্ভুল অবস্থান হলো—সৌদি আরব হুথিদের হামলার বিরুদ্ধে সামরিকভাবে সক্রিয় হয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নতুন মামলা দায়েরের খবর এখনো নিশ্চিত নয়। বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা মামলা দায়েরের খবর হিসেবে প্রচার করা তথ্যগতভাবে ঠিক হবে না।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর