ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রে বিকট শব্দে ঘুম হারাম মিসিসিপির বাসিন্দাদের

<p style="margin-right: 0px; margin-bottom: 12px; margin-left: 0px; font-style: normal; font-variant-caps: normal; font-width: normal; font-size: 20px; line-height: normal; font-family: &quot;Times Ne

ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রে বিকট শব্দে ঘুম হারাম মিসিসিপির বাসিন্দাদের

ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রে বিকট শব্দে ঘুম হারাম মিসিসিপির বাসিন্দাদের


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ হ্যাভেন এলাকায় ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশাল কম্পিউটার কেন্দ্র চালাতে ব্যবহৃত গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আসা একটানা গুঞ্জন, উচ্চস্বরে যন্ত্রের শব্দ ও কম্পনের কারণে আশপাশের বাসিন্দারা রাতের ঘুম হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি এখন শুধু স্থানীয় অসন্তোষে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন বাসিন্দা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। 


তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, অভিযোগের মূল কেন্দ্রটি মিসিসিপির দক্ষিণ হ্যাভেনে অবস্থিত একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থাপনা, যা মেমফিস অঞ্চলে মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কম্পিউটার কেন্দ্রগুলোকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেসন হ্যালি ও টেইলর লগসডনসহ স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত শব্দ ও কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে এবং এর ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। 


জেসন হ্যালি দক্ষিণ হ্যাভেনে প্রায় দুই দশক ধরে বসবাস করছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগে তার এলাকার রাত ছিল তুলনামূলক শান্ত। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তিনি এমন একটানা গুঞ্জনের কথা বলেছেন, যা তার কাছে অনেকটা মাথার ওপর একটি বিমান ক্রমাগত উড়ে যাওয়ার মতো মনে হয়। কখনো কখনো গভীর রাতেও সেই শব্দ বন্ধ হয় না বলে তার অভিযোগ।


সিবিএসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এক রাতে ভোর চারটা পর্যন্ত ঘুমাতে পারেননি হ্যালি। তিনি স্থানীয় মেয়র ড্যারেন মুসেলহোয়াইটকে একাধিকবার বিষয়টি জানান। মেয়রও শব্দের সমস্যাটি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। পরে হ্যালিকে নিজের বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 


হ্যালির অভিযোগ শুধু ঘুমের সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মাথাব্যথা, কানে শব্দ শোনা এবং দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপের কথাও বলেছেন। নিজের বাড়ির পেছন থেকে রাতের বেলায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে তার ফলাফলও প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন।


স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের আরেকটি পরীক্ষাতেও ওই এলাকায় শব্দের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একটি স্থানীয় টেলিভিশন দল বিভিন্ন জায়গায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে। স্থাপনার কাছাকাছি এলাকায় তাদের পরিমাপে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ পাওয়া যায়। অন্য একটি আবাসিক এলাকায় ৪৮ থেকে ৫৫ ডেসিবেল এবং আরও দূরের এলাকায় প্রায় ৪২ থেকে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত মাত্রা পাওয়া যায়। তবে এই পরীক্ষা স্থানীয় পর্যায়ে করা হয়েছিল এবং এটিকে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিবেশগত পরিমাপ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। 


টেইলর লগসডনের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। তিনি এক দশকেরও বেশি সময় আগে পরিবার নিয়ে দক্ষিণ হ্যাভেনে বাড়ি করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন এলাকাটি ছিল শান্ত এবং পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য স্বস্তিদায়ক। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কার্যক্রম বাড়ার পর সেই পরিবেশ বদলে গেছে।


লগসডন জানিয়েছেন, শব্দ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে কখনো কখনো তার বাড়িও কেঁপে ওঠে বলে মনে হয়। তিনি মাথাব্যথা, উদ্বেগ এবং কানে অবিরাম শব্দ শোনার সমস্যার কথা বলেছেন। তার সন্তানদের মধ্যেও একই ধরনের কানে শব্দ শোনার অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। পরিবারের নিয়মিত ঘুম ব্যাহত হওয়ায় সন্তানদের দিনের বেলায় ক্লান্তি দেখা যাচ্ছে বলেও তার দাবি। 


শব্দ কমানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটি ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এমন অভিযোগ অবশ্য পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী, শব্দ কমানোর জন্য ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। শব্দরোধী দেয়াল, শব্দনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং নতুন ধরনের আরও নীরব প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য হলো, এখন পর্যন্ত স্থাপন করা একটি বড় শব্দরোধী দেয়াল তাদের প্রত্যাশিত স্বস্তি দিতে পারেনি। 


দক্ষিণ হ্যাভেনের বাসিন্দাদের অভিযোগের পাশাপাশি পরিবেশ নিয়েও আলাদা উদ্বেগ রয়েছে। এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক গ্যাসচালিত টারবাইন ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে টারবাইনের সংখ্যা বেড়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে পরিবেশগত অনুমোদন ও বায়ুদূষণ নিয়েও মামলা হয়েছে। রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব টারবাইন থেকে সম্ভাব্য বায়ুদূষণ নিয়ে পরিবেশবাদী ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। 


তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আলাদা করে পরিষ্কার করা দরকার। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, সাময়িকভাবে ব্যবহৃত ৬৯টি মোবাইল টারবাইন ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মিসিসিপি পরিবেশ দপ্তরের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে এগুলো সরানোর কাজ শুরু হওয়ার কথা এবং ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সব সাময়িক টারবাইন সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে, যেখানে ৪১টি স্থায়ী টারবাইন থাকার কথা বলা হয়েছে। 


এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, শব্দের সমস্যা নিয়ে বাসিন্দাদের অভিযোগকে একেবারে ভিত্তিহীন বলা যায় না। বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে একই ধরনের শব্দের অভিযোগ, স্থানীয় কর্মকর্তাদের স্বীকৃতি, স্বাধীনভাবে করা শব্দ পরিমাপ এবং আদালতে দায়ের হওয়া মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বাসিন্দাদের মাথাব্যথা, কানে শব্দ শোনা বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার প্রত্যেকটির সরাসরি কারণ ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রই—এমন চূড়ান্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই এসব বিষয়কে অভিযোগ বা বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা হিসেবেই উপস্থাপন করা সঠিক। 


আদালতের মামলাটিও বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে জেসন হ্যালি, টেইলর লগসডন ও আরও একজন বাসিন্দা মামলা করেন। মামলাটি মিসিসিপির উত্তরাঞ্চলের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা হয়েছে এবং এতে অতিরিক্ত শব্দ, কম্পন, সম্পত্তি ব্যবহারে বাধা এবং জীবনযাত্রার ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, বাদীরা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে দীর্ঘস্থায়ী বিরক্তি ও ক্ষতির উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। 


এরপর সেপ্টেম্বরেও মামলাটি নিয়ে আইনি লড়াই চলতে দেখা গেছে। আদালতের নথি সম্পর্কিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে মামলার কিছু দাবি খারিজের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং বাদীপক্ষ সেই অবস্থানের বিরোধিতা করেছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি এবং আদালত এখনো চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত দেয়নি যে প্রতিষ্ঠানটি বাসিন্দাদের অভিযোগের জন্য আইনগতভাবে দায়ী কি না। 


এদিকে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ হ্যাভেন এলাকায় বিশাল বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, মেমফিস অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশাল কম্পিউটার অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, এই প্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও কর রাজস্ব তৈরি করছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অংশীদারত্ব বজায় রেখে পরিবেশগত প্রভাব ও শব্দ কমানোর চেষ্টা করছে। 


কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অর্থনৈতিক লাভের হিসাবের চেয়ে নিজেদের বাড়িতে শান্তিতে থাকা এবং রাতে ঘুমাতে পারা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। আবার অনেক পরিবারের পক্ষে হঠাৎ বাড়ি বিক্রি করে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, সেটিই এখন বড় বিতর্ক।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর