ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, শতাধিক স্কুলে পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ দেশজুড়ে

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ তীব্র হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে এবং বাড়ছে উদ্বেগ।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, শতাধিক স্কুলে পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ দেশজুড়ে

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, শতাধিক স্কুলে পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ দেশজুড়ে


ফ্রান্সজুড়ে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন এবং দীর্ঘ পাঠসূচির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন দেশটির বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে। রাজধানী প্যারিসের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সোমবারও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সার্ত্রুভিল এলাকায় ধারণ করা দৃশ্যে নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি অবস্থান দেখা গেছে। 


সোমবার ৫ অক্টোবর সকালে ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, দেশজুড়ে ৪১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে বিক্ষোভ, অবরোধ অথবা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। তবে দিনের পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সোমবার মোট ৫৮৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণভাবে পাঠদান বন্ধ ছিল, আবার কোথাও আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ রেখে নিরাপত্তার কারণে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। 


আন্দোলনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী সোমবার বিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ চলাকালে গুরুতর আহত হয়েছে এবং তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঘটনার পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পুলিশের ছোড়া একটি বিস্ফোরক ধরনের সরঞ্জাম সে হাতে তুলে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হয়ে থাকতে পারে। তবে ঠিক কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং পুলিশের ব্যবহৃত সরঞ্জামটির ভূমিকা কী ছিল, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে। 


ফ্রান্সের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখছে। ঘটনাটি নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এরই মধ্যে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ব্যবহৃত শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠি, কাঁদানে গ্যাস এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের মাত্রা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার থাকলেও অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং পুলিশকে আক্রমণের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। 


এই আন্দোলনের পেছনে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বহুদিনের। অনেক শিক্ষার্থী বলছে, বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত হলে তার পরিবর্তে নিয়মিতভাবে অন্য শিক্ষক পাওয়া যায় না। ফলে একই শ্রেণিতে দীর্ঘ সময় ধরে পাঠদান ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও একটি শ্রেণিতে ৩৫ জন বা তারও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এত বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণি পরিচালনার কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের ওপর চাপ বাড়ছে এবং শিক্ষার মান কমছে। 


বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। বহু শিক্ষার্থী পুরোনো ভবন, পর্যাপ্ত সংস্কারের অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং গরমের সময় শ্রেণিকক্ষে অসহনীয় তাপমাত্রার অভিযোগ করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক উষ্ণ আবহাওয়ার সময়ে অনেক শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, সরকার শুধু পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আলোচনা না করে তারা প্রতিদিন যে পরিবেশে পড়াশোনা করছে, সেই বাস্তব সমস্যাগুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। 


দীর্ঘ পাঠসূচিও আন্দোলনের অন্যতম কারণ। শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, প্রতিদিনের ক্লাস, বাড়ির কাজ, পরীক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি মিলিয়ে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। আন্দোলনকারীরা এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা কীভাবে উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত হচ্ছে, তার নিয়ম ও মানদণ্ড আরও পরিষ্কারভাবে জানতে পারবে। 


আন্দোলনটি প্রথমে প্যারিসের আশপাশের এলাকায় সীমিত থাকলেও দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ কয়েক দিনের মধ্যে বড় আকার নেয়। পরে প্যারিস, লিল, লঁস, ত্যুলুজসহ বিভিন্ন শহরের বিদ্যালয়ের সামনে অবরোধ, মিছিল ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কোথাও বর্জ্যের পাত্রে আগুন দেওয়া হয়েছে, কোথাও বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিছু ঘটনায় বিদ্যালয়ের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 


পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ আন্দোলনের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকেও পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল নিক্ষেপ ও অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ফলে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


আন্দোলনের ব্যাপকতা বোঝাতে গ্রেপ্তারের সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ৫ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে, যাদের বড় অংশ কিশোর। তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কর্মীদের মধ্যে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। অন্তত ২৪টি বিদ্যালয় ভাঙচুর বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 


তবে সরকার বলছে, শিক্ষার্থীদের কিছু অভিযোগ বাস্তব এবং সেগুলো সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু ইতোমধ্যে শিক্ষা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষক সংকট মোকাবিলা ও অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয় ভবনের অবস্থা উন্নত করা, শিক্ষার্থীদের দৈনিক পাঠসূচি পুনর্বিন্যাস করা, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। 


সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অক্টোবরের শেষ নাগাদ এসব বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের সময়সূচি প্রকাশের চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি যেসব বিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ও ভবনের অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে, সেখানে দ্রুত পাঠদান শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক সংকট কমাতে শূন্য পদ পূরণ এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 


এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি শিক্ষক সংগঠনগুলোর সমর্থন পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ফ্রান্সের শিক্ষক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে তাদের নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবিরও মিল রয়েছে। শিক্ষক সংকট, পর্যাপ্ত অর্থের অভাব, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে তারাও দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। 


মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর দেশজুড়ে আরও বড় কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি শিক্ষক ও অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনও এতে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে মঙ্গলবারের কর্মসূচি আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার একদিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার স্বীকার করছে, অন্যদিকে সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ক্ষতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর