তেলের দাম কমতেই মার্কিন শেয়ারবাজারে উত্থান, নাসডাক নতুন রেকর্ডের একেবারে কাছে
তেলের দাম কিছুটা কমায় ওয়াল স্ট্রিটে স্বস্তি ফিরেছে। প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে উত্থানে নাসডাক নতুন রেকর্ড ছোঁয়ার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
তেলের দাম কমতেই মার্কিন শেয়ারবাজারে উত্থান, নাসডাক নতুন রেকর্ডের একেবারে কাছে
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে নতুন সপ্তাহের শুরুতেই কিছুটা উত্থান দেখা গেছে। সোমবার, ৫ অক্টোবর, ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় লেনদেন করেছে। এর মধ্যে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে গ্রীষ্মকালের রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে নতুন রেকর্ড ছোঁয়ার পথে এগিয়েছে। অন্যদিকে ডাও জোন্স প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে।
বাজারের এই ওঠানামার অন্যতম প্রধান কারণ তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশ অস্থির ছিল। সোমবার সেই দাম কিছুটা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি দেখা দিয়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০১ দশমিক ৯৪ ডলারের আশপাশে ছিল।
তেলের দাম কমার বিষয়টি মার্কিন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু গাড়িতে গ্যাসোলিনের দামই বাড়ে না, পরিবহন, বিমান চলাচল, পণ্য সরবরাহ, উৎপাদন এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার খরচও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দাম ও সেবার মূল্যে চলে যেতে পারে। ফলে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরে এসেছে এমনটি বলা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার সোমবার প্রায় ৫ দশমিক ২৯ শতাংশে উঠেছে। এটি ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। বন্ডের সুদের হার বেশি থাকলে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে এবং অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারের পাশাপাশি তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি বন্ডের দিকেও ঝুঁকতে পারেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সেবা খাত এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে, তবে প্রত্যাশার তুলনায় সেই সম্প্রসারণের গতি কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন উপকরণের খরচ বেড়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি একদিকে সক্রিয় থাকলেও অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সাধারণ মার্কিন পরিবারগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেয়ারবাজারের সূচক রেকর্ডের কাছাকাছি থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে দেশের প্রতিটি পরিবার একইভাবে আর্থিকভাবে স্বস্তিতে রয়েছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ অনেক পরিবারের বাজেটকে এখনো প্রভাবিত করছে।
সাম্প্রতিক চাকরির বাজারের তথ্যও অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন চাকরি বেড়েছে মাত্র ২৯ হাজার, যেখানে অর্থনীতিবিদেরা প্রায় ৯০ হাজার নতুন চাকরি আশা করেছিলেন। আগস্টের চাকরি বৃদ্ধির হিসাবও নিচের দিকে সংশোধন করা হয়েছে। বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
তবে এই দুর্বল চাকরির তথ্যকে এখনো ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দার লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শ্রমবাজারে ব্যাপক ছাঁটাইয়ের প্রমাণ নেই এবং বেকার ভাতার জন্য নতুন আবেদনও তুলনামূলকভাবে নিচু পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ চাকরির বাজারের গতি কমেছে, কিন্তু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি সংকটের পর্যায়ে যায়নি।
চাকরির বাজার দুর্বল হওয়ার একটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশার পরিবর্তন। দুর্বল চাকরির তথ্যের পর অক্টোবর মাসেই আবার সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বাজারে কমেছে। রয়টার্সের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি মাসে আরেক দফা সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এটি শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হতে পারে। কারণ সুদের হার বেশি হলে কোম্পানির ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ারের তুলনামূলক আকর্ষণ কমতে পারে। বিপরীতে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমলে প্রযুক্তি ও প্রবৃদ্ধিনির্ভর কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
সোমবার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে সেই প্রবণতার কিছুটা প্রতিফলন দেখা গেছে। নাসডাকের উত্থান তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখনো শক্তিশালী রয়েছে।
কোম্পানি পর্যায়েও সোমবার বড় ধরনের কিছু লেনদেন বাজারে প্রভাব ফেলেছে। পরিবহন খাতের কোম্পানি আরএক্সওর শেয়ার প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে সিএইচ রবিনসনের সঙ্গে অধিগ্রহণ চুক্তির খবর রয়েছে। একই দিনে পিটিসির শেয়ার প্রায় ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে, কারণ শ্নাইডার ইলেকট্রিক প্রায় ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে কোম্পানিটি কিনতে সম্মত হয়েছে।
এই ধরনের অধিগ্রহণ ও বড় করপোরেট চুক্তি সাধারণত নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে দ্রুত প্রভাব ফেলে। কোনো কোম্পানি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দামে অধিগ্রহণ হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও সোমবার মিশ্র পরিস্থিতি দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে প্রযুক্তি খাতের শক্তিশালী অবস্থান বাজারকে সহায়তা করেছে। বিপরীতে ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ফ্রান্সের বাজেট ও সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপের বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতি। চাকরির বাজার ধীর হচ্ছে, তেলের দাম অস্থির, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং সরকারি বন্ডের সুদের হার অনেক উঁচু। তারপরও ভোক্তাদের ব্যয় শক্তিশালী থাকায় অর্থনীতি এখনো বড় ধরনের দুর্বলতার সংকেত দিচ্ছে না।
এ কারণে বাজার বিশেষজ্ঞদের জন্য আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য, চাকরির বাজার এবং কোম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক আয় ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
সোমবারের বাজারে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো, তেলের দাম কিছুটা কমায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং প্রযুক্তি শেয়ারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে নাসডাক নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে। তবে উচ্চ বন্ড সুদ, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখনো বাজারের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে। তাই ওয়াল স্ট্রিটে নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনা তৈরি হলেও সামনে অস্থিরতাও থাকতে পারে।