বাব আল-মান্দাব ঘিরে ইয়েমেনে তীব্র লড়াই, হুতিদের সরবরাহপথ কাটার দাবি সামনে

বাব আল মান্দাবের কাছে সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রার দাবি, তবে ধুবাবের নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

বাব আল-মান্দাব ঘিরে ইয়েমেনে তীব্র লড়াই, হুতিদের সরবরাহপথ কাটার দাবি সামনে

বাব আল-মান্দাব ঘিরে ইয়েমেনে তীব্র লড়াই, হুতিদের সরবরাহপথ কাটার দাবি সামনে


ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে সরকারি বাহিনী ও হুতি যোদ্ধাদের মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে আল আরাবিয়া জানিয়েছে, ইয়েমেনের জায়ান্টস ব্রিগেড ও ন্যাশনস শিল্ড বাহিনী ধুবাব এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং হুতিদের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়েছে। একই সঙ্গে এসব বাহিনী ধুবাবে হুতিদের সরবরাহপথ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলেও সূত্রগুলো দাবি করেছে। তবে এই দাবির সবগুলো অংশ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাব আল-মান্দাব ঘিরে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত বদলাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে হুতি বাহিনী ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল বরাবর দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোকা, ধুবাবসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নেয়। একই সময়ে তারা বাব আল-মান্দাবের মাঝামাঝি অবস্থিত মায়ুন দ্বীপের দিকেও অগ্রসর হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইয়েমেনি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ধুবাব ও মায়ুনে হুতিদের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। 

এই অগ্রগতি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর জন্য বড় সামরিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কারণ বাব আল-মান্দাব শুধু ইয়েমেনের একটি উপকূলীয় এলাকা নয়; এটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে কোনো পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক হুতি অগ্রযাত্রা নিয়ে রয়টার্সও প্রণালিটির কৌশলগত গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা জানিয়েছে। 

তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই সরকারি বাহিনী পাল্টা অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা শুরু করে। ১৮ সেপ্টেম্বর ইয়েমেন মনিটর সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, সরকারি বাহিনীর সঙ্গে জায়ান্টস ব্রিগেড, ন্যাশনস শিল্ড বাহিনী ও স্থানীয় উপজাতীয় যোদ্ধারা বাব আল-মান্দাবের দিকে তাকিয়ে থাকা কাহবুব পাহাড়ি এলাকা পুনর্দখল করেছে। ওই উচ্চভূমি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ফলে ধুবাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সরকারি বাহিনী তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 

এরপরও সংঘর্ষ থামেনি। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জায়ান্টস ব্রিগেড দাবি করে, তারা বাব আল-মান্দাবের কাছে কাহবুব এলাকায় হুতিদের ধারাবাহিক আক্রমণ প্রতিহত করেছে এবং কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখল করেছে। একই সময়ে স্থানীয় সামরিক সূত্রগুলো জানায়, তায়েজ ও লাহজ প্রদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে গোলাবিনিময় এবং স্থলযুদ্ধ অব্যাহত ছিল। 

২১ সেপ্টেম্বর জায়ান্টস ব্রিগেড আরও দাবি করে, বাব আল-মান্দাবের দিকে তাকিয়ে থাকা কাহবুব এলাকায় হুতিদের পাঁচটি সামরিক যান ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ওই দাবির বিষয়ে হুতি পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে হতাহতের সংখ্যা বা যান ধ্বংসের মাত্রা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। 

এদিকে চলতি মাসের শুরুতে পরিস্থিতি আরও বড় সামরিক সংঘাতের দিকে গড়ায়। ৪ অক্টোবর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনর্দখলের জন্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। রাষ্ট্রপতি পরিষদের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। রয়টার্স ও বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, এই অভিযানের লক্ষ্য হুতিদের সাম্প্রতিক দখল করা পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দাবসংলগ্ন এলাকা পুনরুদ্ধার করা। 

এই পরিস্থিতিতে আল আরাবিয়ার সামরিক সূত্রের দেওয়া নতুন তথ্যকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং কাহবুব, লাহজ, তায়েজ ও ধুবাব ঘিরে কয়েক সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি আক্রমণের ধারাবাহিকতার মধ্যেই জায়ান্টস ব্রিগেড ও ন্যাশনস শিল্ড বাহিনীর নতুন অগ্রযাত্রার দাবি এসেছে। ফলে ওই এলাকায় সরকারি বাহিনী চাপ বাড়াচ্ছে—এমন ধারণার পক্ষে আগের কয়েকটি প্রতিবেদনে যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, হুতিদের ধুবাবের সরবরাহপথ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে রয়েছে। এই অংশটি এখনো সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে সরকারি বাহিনীর কাহবুব দখল, হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ এবং ধুবাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনার কথা পাওয়া গেলেও সরবরাহপথ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার স্বাধীন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত সামরিক বাস্তবতা না বলে সংশ্লিষ্ট সামরিক সূত্রের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করাই তথ্যগতভাবে সঠিক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুতিদের সেপ্টেম্বরের দ্রুত অগ্রযাত্রার কারণে সরকারি ও হুতিবিরোধী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিবিরোধী শিবিরে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে এবং তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য সবসময় এক নয়। ফলে জায়ান্টস ব্রিগেড ও ন্যাশনস শিল্ড বাহিনীর বর্তমান অগ্রযাত্রা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে তাদের সমন্বয়, রসদ, বিমান সহায়তা এবং স্থানীয় ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের ওপর। 

মানবিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তায়েজসহ পশ্চিম ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারীও সাম্প্রতিক সময়ে হুতি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর