নাবলুসের কাছে দুই ফিলিস্তিনি শিশু আটক, বন্দিজীবনে নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ
নাবলুসের কাছে দুই শিশুকে আটকের খবরের পর ফিলিস্তিনি শিশুদের বন্দিজীবনে নির্যাতন ও চিকিৎসাবঞ্চনার অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে।
নাবলুসের কাছে দুই ফিলিস্তিনি শিশু আটক, বন্দিজীবনে নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুসের পশ্চিমে দেইর শরাফ এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই ফিলিস্তিনি শিশুকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী এলাকাটিতে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালানোর সময় দুই শিশুকে আটক করে। একই দিনের স্থানীয় প্রতিবেদনে আটক দুই শিশুর নাম কারিম মারাই মুসা ও ফারুক আনমার নওফাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের বয়স, আটকের নির্দিষ্ট কারণ এবং বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, নাবলুসের পশ্চিমে দেইর শরাফ থেকে দুই শিশুকে আটকের মূল দাবিটি বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওয়াফার প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে অন্য সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, দেইর শরাফে অভিযানের সময় দুই অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বক্তব্যে শিশুদের আটকের পাশাপাশি তাদের ওপর নির্দিষ্ট ধরনের নির্যাতনের ঘটনাকেও একই ঘটনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সেই নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও তাৎক্ষণিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই দুই শিশুকে আটকের ঘটনাকে সত্য বলে উল্লেখ করা গেলেও, তাদের সঙ্গে ঠিক কী আচরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
তবে ফিলিস্তিনি শিশুদের আটক ও বন্দিজীবনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক আটকব্যবস্থায় থাকা শিশুদের কাছ থেকে শারীরিক নির্যাতন, দুর্ব্যবহার, অপমানজনক আচরণ এবং কঠোর পরিবেশের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩৫৫ ফিলিস্তিনি শিশু ইসরায়েলি সামরিক হেফাজতে ছিল, যা আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর মধ্যে ১৬৪ শিশু অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই প্রশাসনিক আটক অবস্থায় ছিল বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়।
শিশুদের খাদ্য ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়েও গুরুতর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা। সংস্থাটি বলেছে, আটক শিশুদের মধ্যে অপর্যাপ্ত পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতার কারণে অতিরিক্ত ওজন কমে যাওয়া এবং চর্মরোগের মতো সমস্যা দেখা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি ঘটনায় এক শিশুকে বাড়ি থেকে গভীর রাতে আটক করার পর শারীরিকভাবে আঘাত করা, হাত বাঁধা ও চোখ ঢেকে রাখার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই শিশুকে ২০ দিনের বেশি একাকী আটকে রাখার কথাও জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব অভিযোগ সব আটক শিশুর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য এমন দাবি করা যায় না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিশু সম্পর্কে আলাদা অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে নির্দিষ্ট কোনো শিশুর বিরুদ্ধে কী ঘটেছে, তা জানতে পরিবার, আইনজীবী, চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের তথ্য প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনি শিশুদের আটক নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো সামরিক বিচারব্যবস্থার আওতায় তাদের অবস্থান। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা বলেছে, শিশুদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার ও কিশোর বিচারব্যবস্থার মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন এবং অভিযোগ ছাড়া শিশুদের প্রশাসনিক আটক বন্ধ করা উচিত।
২০২৬ সালেও পশ্চিম তীরে শিশুদের ঘিরে সহিংসতার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। আগস্টে নাবলুসের আসকার শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি অভিযানের সময় ১৪ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি কিশোর গুলিতে গুরুতর আহত হয়। পরবর্তী প্রতিবেদনে তাকে নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই কিশোরের বুকে গুলি লাগে।
এ ছাড়া আগস্টে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন শিশুসহ ফিলিস্তিনিদের আটকের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। আগস্টের এক অভিযানে নাবলুস, তুবাস ও বেথলেহেম এলাকায় সাতজনকে আটক করার কথা জানানো হয়, যাদের মধ্যে দুই শিশু ছিল। সেপ্টেম্বরে আবার পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০ ফিলিস্তিনিকে আটকের খবর আসে, যার মধ্যে দুই শিশু ছিল।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে শিশুদের ওপর চাপ শুধু আটকেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ সালে শিক্ষা-সম্পর্কিত ৯৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে শিশু নিহত, আহত বা আটক হওয়া, বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে বাধার মতো ঘটনাও রয়েছে। চলাচলের ওপর বিপুলসংখ্যক বিধিনিষেধের কারণে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনও ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর গুরুতর নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা জানিয়েছে। জুনে প্রকাশিত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনি শিশুরা ইসরায়েলি কারাগার ও আটককেন্দ্রে নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়ার অভিযোগ জানিয়েছে। কমিশন শিশুদের সুরক্ষা এবং এসব অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সাধারণত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে পশ্চিম তীরে গ্রেপ্তার ও আটক অভিযান পরিচালনার পক্ষে যুক্তি দেয়। ফিলিস্তিনি পক্ষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আটক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা জরুরি।
সর্বশেষ দেইর শরাফের দুই শিশুর ঘটনায় তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ, আইনজীবী পাওয়ার অধিকার, শারীরিক অবস্থা এবং আটকের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন। সত্যতা যাচাইয়ের ফলাফল হলো দুই শিশুকে আটকের খবরটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে সমর্থিত; কিন্তু তাদের ওপর মারধর, খাদ্যবঞ্চনা, চিকিৎসা না দেওয়া বা একাকী আটকে রাখার নির্দিষ্ট অভিযোগ এই ঘটনার ক্ষেত্রে এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। তবে শিশু আটককেন্দ্রিক নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের বিস্তৃত অভিযোগ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে নথিভুক্ত করেছে।