সেদি তেইমান বন্দি নির্যাতন মামলায় অভিযোগ, তদন্ত ও মামলা প্রত্যাহারে নতুন প্রশ্ন
ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও পরে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে, তবে ঘটনাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি এবং বিতর্ক রয়ে গেছে।
সেদি তেইমান বন্দি নির্যাতন মামলায় অভিযোগ, তদন্ত ও মামলা প্রত্যাহারে নতুন প্রশ্ন
ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও পরে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে, তবে ঘটনাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি এবং বিতর্ক রয়ে গেছে।
ইসরায়েলের সেদি তেইমান আটককেন্দ্রে ফিলিস্তিনি এক বন্দির ওপর গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে বিতর্ক চলছে, সাম্প্রতিক আইনি সিদ্ধান্তের পর তা আরও জটিল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন বক্তব্যে ঘটনাটিকে কখনো নিশ্চিত ধর্ষণ হিসেবে, আবার কখনো পুরোপুরি সাজানো অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ্য সরকারি নথি ও তদন্তসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাস্তবতা এই দুই চরম দাবির মাঝামাঝি।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ জুলাই সেদি তেইমান আটককেন্দ্রে। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী একদল সেনার বিরুদ্ধে এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে তল্লাশির সময় গুরুতরভাবে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে বন্দিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে একাধিক গুরুতর আঘাতের কথা নথিবদ্ধ করেন। এর মধ্যে পাঁজরের হাড় ভাঙা, ফুসফুসে আঘাত এবং মলদ্বারে গুরুতর ক্ষতের কথা তদন্তসংক্রান্ত নথিতে উঠে আসে। এই চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যই পরবর্তী তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
অভিযোগ সামনে আসার পর ইসরায়েলি সামরিক পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং সন্দেহভাজন সেনাদের আটক করে। ওই গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের ভেতরেও তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কয়েকজন বিক্ষোভকারী সামরিক স্থাপনায় ঢুকে পড়েন এবং অভিযুক্ত সেনাদের পক্ষে বিক্ষোভ করেন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি আটককেন্দ্রে নির্যাতনের অভিযোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ইসরায়েলের সামরিক বিচারব্যবস্থা, সেনাদের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি করে।
পরবর্তীতে ঘটনাটির একটি নজরদারি ভিডিও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ভিডিওতে কয়েকজন সেনাকে বন্দিকে ঘিরে রাখতে দেখা যায়। তবে পুরো ঘটনাটি ভিডিওতে দৃশ্যমান ছিল না। কিছু অংশ ঢালের আড়ালে ছিল। ফলে প্রকাশিত ভিডিও একাই অভিযোগের প্রতিটি দিক নিশ্চিত করে না। একই সঙ্গে ভিডিওটি প্রকাশের পর চিকিৎসা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তদন্ত-উপাদানও পর্যালোচনা করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ ইসরায়েলি সংরক্ষিত সেনার বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতন এবং গুরুতর শারীরিক ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে যেভাবে নিশ্চিত ধর্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রের আইনি ভাষা তার সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। অভিযোগের কেন্দ্র ছিল গুরুতর নির্যাতন ও শারীরিক ক্ষতি। অভিযুক্ত সেনারা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এরপর মামলাটি নতুন মোড় নেয়। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সামরিক আইন কর্মকর্তা পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্তের অর্থ সেনারা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়নি এবং তাদের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি বিচার আর এগোয়নি। কিন্তু অভিযোগ প্রত্যাহার হওয়াকে সরাসরি নির্যাতনের ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার সমান বলা যায় না। কারণ অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে তদন্তের প্রমাণ, সাক্ষ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা এবং ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে একাধিক সমস্যা তুলে ধরা হয়েছিল।
সামরিক আইন কর্মকর্তার ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, বন্দিকে পরবর্তী সময়ে গাজায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ফলে তাঁকে আদালতে হাজির করা এবং জেরা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আগের সামরিক আইন কর্মকর্তার সময় তদন্তসংক্রান্ত ভিডিও সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার ঘটনাও মামলার ন্যায়সংগত বিচার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এসব পরিস্থিতিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধ আদালতে প্রয়োজনীয় মানদণ্ডে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে ।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগ প্রত্যাহার হলেও চিকিৎসা-সংক্রান্ত আঘাতের নথি অদৃশ্য হয়ে যায়নি। চিকিৎসকদের নথিতে বন্দির গুরুতর শারীরিক আঘাতের তথ্য রয়েছে। ফলে একজন বন্দি কীভাবে এত গুরুতর আহত হলেন, সেই প্রশ্ন এখনো আলাদা তদন্ত ও মানবাধিকার বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে। তবে ওই আঘাতের প্রতিটি কারণ বা কোন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে তা ঘটেছে, তা আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ঘটনাটির আরেকটি দিক হলো তদন্তসংক্রান্ত ভিডিও ফাঁস। আগের সামরিক আইন কর্মকর্তা ইয়িফাত তোমের-ইয়েরুশালমি পরে ভিডিও ফাঁসের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেছিলেন এবং ২০২৫ সালের শেষ দিকে পদত্যাগ করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে নতুন সামরিক আইন কর্মকর্তা মামলাটি পুনর্মূল্যায়ন করেন এবং অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন।
এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে বলা হচ্ছে, অভিযুক্ত সেনারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে যে পুরো ঘটনাটি মিথ্যা ছিল। এই ব্যাখ্যাও অতিরঞ্জিত। কোনো সাংবাদিক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হলে সেটি আলাদা আইনি প্রক্রিয়া; সেই মামলা নিজে থেকেই মূল নির্যাতনের অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে না। একইভাবে অভিযোগ প্রত্যাহারও সেনাদের নির্দোষতার বিচারিক ঘোষণা নয়, কারণ পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ বিচার ও চূড়ান্ত রায় হয়নি।
অতএব তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে সবচেয়ে নির্ভুল সিদ্ধান্ত হলো, সেদি তেইমান আটককেন্দ্রে একজন ফিলিস্তিনি বন্দির গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা এবং তাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও গ্রেপ্তার সত্য। পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও আনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের মার্চে সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাই “সেনারা নির্যাতনের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছে” বলা যেমন ভুল, তেমনি “অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে” বলাও ভুল।
জোসেফ কোহেনের বক্তব্যের যে অংশে বলা হয়েছে, সামরিক পুলিশ অভিযুক্ত সেনাদের আটক করার পর ঘটনাটি বড় আকারে প্রকাশ্যে আসে, সেটি মূল ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তাঁর বক্তব্যকে এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যেন সেটিই প্রমাণ করে যে বন্দির ওপর কোনো গুরুতর নির্যাতন ঘটেনি। প্রকাশ্য নথিতে গুরুতর শারীরিক আঘাতের প্রমাণ, তদন্ত, গ্রেপ্তার এবং অভিযোগপত্র সবই ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রমাণের সীমাবদ্ধতা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের কারণে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে।
সুতরাং এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলোঅভিযোগ ছিল বাস্তব এবং রাষ্ট্রীয় তদন্তে তা গুরুত্ব পেয়েছিল; গুরুতর আঘাতের চিকিৎসা-নথিও ছিল; কিন্তু যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বিচারিকভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হয়নি এবং অভিযুক্ত পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে মামলা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাই ঘটনাটিকে এক কথায় “প্রমাণিত ধর্ষণ” অথবা “সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ” কোনোটিই বলা তথ্যসম্মত নয়।