হরমুজে ট্যাংকারে হামলা, সাত শর্তে অটল ইরান; বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা ও ইরানের সাত শর্ত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়েছে।
হরমুজে ট্যাংকারে হামলা, সাত শর্তে অটল ইরান; বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে প্রণালির ভেতরে এবং ওমানের উপকূলের কাছাকাছি একাধিক তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব হামলার পেছনে সরাসরি ইরান দায়ী এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা ঘটনাগুলোকে হামলা হিসেবে নথিভুক্ত করলেও অস্ত্রের উৎস ও হামলাকারীর পরিচয় নিয়ে তদন্ত চলছে।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় ওমানের প্রায় চার নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদে ছিলেন এবং প্রাথমিকভাবে সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি ওমানের কাছাকাছি হলেও হরমুজ প্রণালির সরাসরি প্রবেশপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর আগে হরমুজ প্রণালির ভেতরেও একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জাহাজে সামান্য আগুন ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং নাবিকদের নিরাপদ থাকার কথা জানানো হয়। এই ঘটনার দায়ও কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে জাহাজে হামলার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে একাধিক হামলার খবর নথিভুক্ত হয়েছে এবং অক্টোবরের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, এসব ঘটনা সবসময় নির্দিষ্ট কোনো জাহাজকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা নাও হতে পারে; বরং নির্দিষ্ট এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে সেখানে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রশ্নে ইরান কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে। ইরানের সংসদের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুনে করা অন্তর্বর্তী সমঝোতায় নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না। ইরানের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে এমন একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল যে শর্তগুলো পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক জায়গায় যে দাবি ছড়িয়েছে, ইরানের সাত শর্ত নাকি নতুন করে তৈরি করা হয়েছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচিত ইসলামাবাদ সমঝোতার খসড়ায় যুদ্ধবিরতি, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল, ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক সহায়তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ওই নথিটি একটি খসড়া দলিল হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল; তাই এটিকে চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর।
খসড়া সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। আরও বলা হয়েছে, ইরানকে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। একই নথিতে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।
ফলে বর্তমান সংকট শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান বলছে, হরমুজ পুনরায় খুলতে হলে আগে সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামরিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখছে। দুই পক্ষের অবস্থানের এই পার্থক্যই সমঝোতার পথকে কঠিন করে তুলছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের কারণে সামুদ্রিক নিরাপত্তার এই অবনতির প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। সাম্প্রতিক হামলার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর আগের গড় মাত্রার কাছাকাছি বা তার ওপরে উঠেছিল। কিন্তু নতুন হামলা ও জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি সেই পুনরুদ্ধারকে আবার অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
বাজারে এর প্রভাবও ইতোমধ্যে স্পষ্ট। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের দামে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজের ঝুঁকি কমাতে বিকল্প বন্দর, পাইপলাইন এবং উপকূলীয় এলাকায় এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের মতো ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তবে এসব বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে হরমুজের স্বাভাবিক নৌপথের পুরো বিকল্প নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে হামলার ঘটনা সত্য, ওমানের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও সত্য, এবং ইরান সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি খুলবে না এমন ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু প্রতিটি হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। কারণ সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি ঘটনায় অস্ত্রের উৎস ও হামলাকারীর পরিচয় এখনো অজ্ঞাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া “ইরান সব হামলার দায় স্বীকার করেছে” বা “হরমুজ সম্পূর্ণভাবে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে” এ ধরনের বক্তব্যকে এখনই নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। বাস্তবতা হলো, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, হামলার সংখ্যা বাড়ছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত আছে। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অগ্রগতি না হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ ঘিরে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।