ইরান-যোগাযোগ সন্দেহে ব্রিটিশ ঘাঁটি ছাড়ল মার্কিন বোমারু বিমান, হামলার আশঙ্কায় বাড়ল উত্তেজনা

ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলার আশঙ্কায় ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সরানো হয়েছে, তদন্ত চললেও তেহরানের সম্পৃক্ততা এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে তদন্তকারীরা।

ইরান-যোগাযোগ সন্দেহে ব্রিটিশ ঘাঁটি ছাড়ল মার্কিন বোমারু বিমান, হামলার আশঙ্কায় বাড়ল উত্তেজনা

ইরান-যোগাযোগ সন্দেহে ব্রিটিশ ঘাঁটি ছাড়ল মার্কিন বোমারু বিমান, হামলার আশঙ্কায় বাড়ল উত্তেজনা


ব্রিটেনের গ্লুচেস্টারশায়ারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ব্যবহৃত রয়্যাল বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রের তদন্তের মধ্যেই এই আকস্মিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ওই ঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা সব মার্কিন বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রের নিজ নিজ ঘাঁটিতে ফিরে গেছে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমান সরানোর নির্দিষ্ট সময় বা পরিচালনাগত বিস্তারিত আগে প্রকাশ করা হয়নি। 

ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওই ঘাঁটি থেকে ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক অভিযানে মার্কিন দূরপাল্লার বোমারু বিমান পরিচালিত হচ্ছিল। সেখানে প্রায় এক ডজন বি-১ ধরনের বোমারু বিমান অবস্থান করছিল। পাশাপাশি বি-৫২ এবং বি-২ ধরনের বিমানও ঘাঁটিটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর অবশ্য জানিয়েছে, বোমারু বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলেও এগুলো পরিচালনাকারী সামরিক সদস্যরা বিশ্বব্যাপী নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতা বজায় রেখেছেন। 

ঘাঁটি থেকে বিমান সরানোর ঘটনা ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সেখানে সম্ভাব্য হামলার ষড়যন্ত্র নিয়ে তদন্ত করছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঘাঁটির আশপাশে সন্দেহজনক কয়েকটি যানবাহন দেখতে পাওয়ার পর নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়। ওই ঘটনায় পাঁচজন ব্রিটিশ নাগরিককে সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অভিযোগে আটক করা হয়েছিল। পরে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা ওই যানবাহনে পেট্রোল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন, তবে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। 

এরপর ১ অক্টোবর লন্ডনে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ব্রিটিশ ও ইরানি দ্বৈত নাগরিক এবং তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সন্দেহ রয়েছে। তাকেও পরে জামিন দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তটি অত্যন্ত জটিল এবং সম্ভাব্য বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাসহ একাধিক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত ঘটনাটিকে চূড়ান্তভাবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নির্দেশে পরিচালিত হামলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। 

তবে ব্রিটেনের গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এর আগে বলেছিলেন, ওই ঘটনার সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততার শক্তিশালী ইঙ্গিত রয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষও সম্ভাব্য বিদেশি রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্ত করছে। ইরান অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং এ ধরনের হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার কথা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ইরান-সমর্থিত সন্ত্রাসী হামলা নিশ্চিত’ ধরনের বক্তব্যকে এখনই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। 

ঘটনার পর মার্কিন বোমারু বিমান দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। কারণ রয়্যাল বিমানঘাঁটি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে মার্কিন দূরপাল্লার বোমারু বিমান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সময়ও ঘাঁটিটি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাম্প্রতিক ইরান সংঘাতের সময় ব্রিটেনও নির্দিষ্ট শর্তে মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটিটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। 

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ব্রিটেনে গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজনদের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাঁচজনকে জামিন দেওয়ার ঘটনায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল বলে ইঙ্গিত দেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। তাই তাদেরকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। 

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনাও একই সময়ে বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে ঘিরে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা কেবল একটি নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত, নাকি বৃহত্তর সামরিক কৌশলের অংশ তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে এটিকে নতুন কোনো হামলা পরিকল্পনা বা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান থেকে সরে আসার ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেনি। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমান সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে কথিত ইরান-সংযুক্ত ষড়যন্ত্রের সরাসরি কারণ-সম্পর্ক এখনো মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। সময়ের দিক থেকে দুটি ঘটনা পরস্পরের কাছাকাছি হলেও, একটি অন্যটির সরাসরি কারণ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর মূলত জানিয়েছে, সব বোমারু বিমান নিজ নিজ ঘাঁটিতে পুনরায় মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকেই দূরপাল্লার অভিযান পরিচালনা করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর