ইরানের সীমান্ত থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে মার্কিন বাহিনী সরেছে দাবি করলেন ফাদাভি

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার আলী ফাদাভির দাবি, মার্কিন বাহিনী সীমান্ত থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে সরে গেছে, তবে স্বাধীন প্রমাণ মেলেনি।

ইরানের সীমান্ত থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে মার্কিন বাহিনী সরেছে দাবি করলেন ফাদাভি

ইরানের সীমান্ত থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে মার্কিন বাহিনী সরেছে দাবি করলেন ফাদাভি


ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর উপপ্রধান আলী ফাদাভি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের সীমান্ত থেকে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে সরে গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর স্থল ও নৌ শক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে এই অবস্থান নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি, ওমান সাগর এবং এমনকি উত্তর ভারত মহাসাগরেও বর্তমানে কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নেই। তবে এই বক্তব্যের সব অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি এবং সাম্প্রতিক প্রকাশ্য সামরিক তথ্যের সঙ্গে এর কিছু অংশের অসামঞ্জস্য রয়েছে। 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এবং ইরানভিত্তিক অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফাদাভি চার অক্টোবর এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও ইরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তাঁর বক্তব্যে আরও বলা হয়, ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি হরমুজের নির্দিষ্ট পথ এড়িয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ফাদাভি এটিকে ইরানের সামুদ্রিক প্রতিরোধক্ষমতার ফল হিসেবে তুলে ধরেন। 

তবে দাবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অর্থাৎ উপসাগর ও আশপাশের জলসীমায় একেবারেই কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নেই এটি নিশ্চিত করার মতো স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোর প্রকাশ্য মার্কিন সামরিক বিবরণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে নৌ অভিযান, জাহাজ চলাচল সুরক্ষা এবং ইরানি জাহাজের বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রম চালিয়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ইরানি বাহিনী একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল এবং এর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার কথা জানায়। এই তথ্য অন্তত প্রমাণ করে যে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌ উপস্থিতি ছিল। 

আরও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার বাড়লেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির রয়েছে। রয়টার্সের পাঁচ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। একই প্রতিবেদনে হরমুজ ও আশপাশের এলাকায় একাধিক জাহাজে হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জলপথে নিরাপত্তা রক্ষায় সামরিক উপস্থিতি ও তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নৌবাহিনী ও মেরিন বাহিনীর শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর প্রস্তুতির কথা এসেছে। চার অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি বিমানবাহী রণতরী এবং একটি উভচর যুদ্ধদল মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর ফলে ফাদাভির ‘কোনো মার্কিন জাহাজ নেই’ বক্তব্যকে সরাসরি সত্য হিসেবে গ্রহণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগরের ভেতরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ না থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুরো আঞ্চলিক নৌ উপস্থিতি প্রত্যাহার করে নেওয়া এক বিষয় নয়। 

ফাদাভির এক হাজার কিলোমিটার দূরে সরে যাওয়ার দাবিও স্বাধীনভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি। কোনো যুদ্ধজাহাজের সুনির্দিষ্ট অবস্থান সামরিক নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ করা না হলে উপগ্রহচিত্র, জাহাজ শনাক্তকরণ তথ্য কিংবা সরকারি বিবৃতি ছাড়া এমন দূরত্ব নিশ্চিত করা কঠিন। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর একজন মুখপাত্র দাবি করেছিলেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ হরমুজের প্রবেশমুখ থেকে অন্তত পাঁচশ কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই দাবি এক হাজার কিলোমিটারের বেশি হওয়া দেখায় যে বক্তব্যগুলো মূলত ইরানের সামরিক মূল্যায়ন ও প্রচারিত অবস্থানের অংশ, স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য নয়। 

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও এই ঘটনার পেছনের বাস্তবতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ এটি। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে পথটি বিপজ্জনক হয়ে উঠলেও সেপ্টেম্বর মাসে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আবার এই অঞ্চলের বন্দরগুলো থেকে বের হয়েছে। কিছু দেশ বিকল্প পাইপলাইন ও স্থানান্তর ব্যবস্থার মাধ্যমে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। তবুও প্রণালিটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

চার অক্টোবর ইরান আবারও জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলবে না। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো, অবরোধ প্রত্যাহার এবং আগের সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়নের বিষয় রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলার খবরও এসেছে। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপও অব্যাহত আছে। 

সব তথ্য একত্রে বিচার করলে ফাদাভির বক্তব্যকে পুরোপুরি মিথ্যা বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবেও প্রচার করা নিরাপদ নয়। ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ যে দাবি করেছে, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। কিন্তু মার্কিন বাহিনী ইরানের সীমান্ত থেকে ঠিক এক হাজার কিলোমিটার বা তার বেশি দূরে সরে গেছে এবং উপসাগর, হরমুজ, ওমান সাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগরে একেবারেই কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নেই এই দুটি দাবির স্বাধীন প্রমাণ বর্তমানে অনুপস্থিত। সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক কার্যক্রম, বাণিজ্যিক জাহাজ সুরক্ষা এবং নতুন নৌবহর মোতায়েনের তথ্য বরং দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ইরানসংক্রান্ত সামরিক পরিস্থিতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত।

তাই এই খবরের সবচেয়ে নির্ভুল মূল্যায়ন হলো, এটি ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি, কিন্তু এর মূল সামরিক অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। চলমান সংঘাত, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। নতুন নির্ভরযোগ্য উপগ্রহচিত্র, মার্কিন সামরিক বিবৃতি বা নিরপেক্ষ সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দাবিটিকে ‘যাচাই না হওয়া দাবি’ হিসেবেই দেখা উচিত। বিশেষ করে যুদ্ধকালীন সময়ে জাহাজের অবস্থান গোপন রাখা স্বাভাবিক। তাই সামরিক পক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি নিরপেক্ষ উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি, যাতে প্রচারণা ও বাস্তব সামরিক পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট থাকে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর