হামলা, গ্রেপ্তার ও হত্যাচেষ্টা পেরিয়ে ট্রাম্প বললেন, আপনাদের নিয়েই সবসময় জয়ী হয়েছি

হামলা, অভিশংসন, গ্রেপ্তার ও হত্যাচেষ্টার প্রসঙ্গ তুলে সমর্থকদের পাশে থাকার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অটুট লড়াইয়ের বার্তা দিলেন ট্রাম্প ওহাইওর সমাবেশে

হামলা, গ্রেপ্তার ও হত্যাচেষ্টা পেরিয়ে ট্রাম্প বললেন, আপনাদের নিয়েই সবসময় জয়ী হয়েছি

হামলা, গ্রেপ্তার ও হত্যাচেষ্টা পেরিয়ে ট্রাম্প বললেন, আপনাদের নিয়েই সবসময় জয়ী হয়েছি


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়গুলোর কথা তুলে ধরে সমর্থকদের উদ্দেশে দৃঢ়তার বার্তা দিয়েছেন। শনিবার ৩ অক্টোবর ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ভ্যান্ডালিয়া শহরে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেন, তাঁকে আক্রমণ করা হয়েছে, অভিশংসন করা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এমনকি তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছে। এরপর তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, তাঁদের পাশে নিয়ে তিনি সবসময় জয়ী হয়েছেন। বক্তব্যটির মূল অংশের সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটি সম্পূর্ণ বানানো নয়; ট্রাম্প সত্যিই ওই সমাবেশে একই অর্থের কথা বলেছেন। 


তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বার্তাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ট্রাম্পের বক্তব্যটি ৪ অক্টোবর রাতের কোনো নতুন হামলা বা হত্যাচেষ্টার ঘোষণা নয়। তিনি তাঁর অতীত রাজনৈতিক ও আইনি ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ টেনে কথাগুলো বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের মধ্যে নতুন কোনো হামলার তথ্য নেই। সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৩ অক্টোবর রাতে ওহাইওর ভ্যান্ডালিয়ায়। বার্তাটিতে ব্যবহৃত “গত রাত” কথাটি তাই সময়ের হিসাবে ওই সমাবেশের রাতকে বোঝাচ্ছে।

 

ট্রাম্পের বক্তব্যের আগে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। এরপর সমর্থকদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, তাঁদের পাশে নিয়ে তিনি বারবার রাজনৈতিকভাবে জয়ী হয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি আরও দাবি করেন, বিভিন্ন বাধা ও হুমকি অতিক্রম করেও তিনি এগিয়ে এসেছেন এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় জয় হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। 


তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের “অভিশংসন” সংক্রান্ত বক্তব্য সত্য। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ তাঁকে দুইবার অভিশংসন করেছিল। প্রথমবার ২০১৯ সালে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এবং দ্বিতীয়বার ২০২১ সালে ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলার পর বিদ্রোহে উসকানির অভিযোগে। তবে দুই ক্ষেত্রেই সিনেটে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তাঁকে পদ থেকে সরানো হয়নি।


ট্রাম্পের “গ্রেপ্তার” হওয়ার কথাটিও পুরোপুরি সত্য, তবে এটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। ২০২৩ সালে জর্জিয়া, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার ও হাজিরার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান। ফলে ৩ অক্টোবরের সমাবেশে তিনি যখন “গ্রেপ্তার” হওয়ার কথা বলেন, তখন তিনি মূলত ২০২৩ সালের আইনি ঘটনাগুলোর কথা স্মরণ করছিলেন। নতুন করে ওই রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। 


“হত্যাচেষ্টার” কথাটিও বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ার বাটলারে নির্বাচনী সমাবেশ চলাকালে বন্দুকধারীর গুলিতে ট্রাম্পের ডান কানে আঘাত লাগে। হামলায় একজন সমাবেশে উপস্থিত ব্যক্তি নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন। হামলাকারী পরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়। ঘটনাটি মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছিল। 


এরপর ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে ট্রাম্পের গলফ খেলার স্থানের কাছে আরেকটি গুরুতর ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা গাছপালার আড়ালে অস্ত্রসহ এক ব্যক্তিকে দেখতে পান এবং গুলি চালান। সন্দেহভাজন ব্যক্তি পালিয়ে গেলেও পরে তাকে আটক করা হয়। মার্কিন তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য প্রচেষ্টা হিসেবে তদন্ত করে। কংগ্রেসের পরবর্তী তদন্তেও এটিকে হত্যাচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 


অতএব, ট্রাম্পের বক্তব্যে তাঁর জীবনের ওপর হামলার প্রসঙ্গটি বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে পোস্টটি ছড়ানো হয়েছে, তাতে মনে হতে পারে যেন সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের ওপর নতুন করে হামলা বা হত্যাচেষ্টা হয়েছে। এমন কোনো তথ্য বর্তমান যাচাইয়ে পাওয়া যায়নি। বরং এটি পুরোনো ঘটনাগুলো স্মরণ করে দেওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্য।


ওহাইওর ওই সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে ভোটারদের উৎসাহিত করা। ট্রাম্প সেখানে সিনেটর জন হাস্টেড এবং গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর পক্ষে প্রচার করেন। তিনি সমর্থকদের ভোট দিতে এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতাতে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। ট্রাম্প দাবি করেন, নির্বাচনে তাঁর দলের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল হতে পারে এবং বড় ধরনের চমক দেখা যেতে পারে। 


সমাবেশে ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি বড় অংশ ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সমালোচনাকে ঘিরে। তিনি দাবি করেন, তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের সময় থেকেই বিরোধীরা তাঁকে আক্রমণ করে আসছে। তাঁর ভাষণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ছিল এবং তিনি সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এ বক্তব্য মূলত তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও নির্বাচনী উদ্দীপনা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে বলে ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়।


ওহাইওর রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ। নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে ওহাইওর সিনেট নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প সেখানে ব্যক্তিগতভাবে প্রচারে গিয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোটারদের কাছে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। 


সমাবেশে অর্থনীতি ও জ্বালানির দাম নিয়েও আলোচনা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওহাইওতে জ্বালানির গড় দাম আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধি এখন নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বে দেশ উন্নতির পথে রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীরা জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দামের চাপকে তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। 


সমাবেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র নিয়েও আলোচনা হয়। এসব তথ্যকেন্দ্রের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার, জমি ও স্থানীয় মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ওহাইওতে বিতর্ক চলছে। ট্রাম্প তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, এসব প্রকল্প বন্ধ করলে বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যেতে পারে। ফলে তাঁর সমাবেশটি শুধু নির্বাচনী প্রচারণায় সীমাবদ্ধ ছিল না; অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান নিয়েও সেখানে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে।

 

ট্রাম্পের “আমরা সবসময় জয়ী হয়েছি” ধরনের বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস প্রকাশের ভাষা। এটি কোনো নিরপেক্ষ পরিসংখ্যানভিত্তিক ঘোষণা নয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অবশ্যই বড় বড় নির্বাচনী জয় রয়েছে, তবে একই সঙ্গে ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিতও হয়েছিলেন। তাই “সবসময় জয়ী” কথাটিকে আক্ষরিক অর্থে প্রতিটি নির্বাচনে জয় হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। এটি তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করাই যথাযথ।


সব মিলিয়ে তথ্য যাচাইয়ের ফল হলো, ট্রাম্পের উদ্ধৃতির মূল বক্তব্য সত্য এবং ৩ অক্টোবর ওহাইওর সমাবেশে তিনি সত্যিই নিজের ওপর হামলা, দুইবার অভিশংসন, ২০২৩ সালের গ্রেপ্তার এবং ২০২৪ সালের হত্যাচেষ্টার প্রসঙ্গ তুলে সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টটি এমনভাবে লেখা হয়েছে, যাতে ঘটনাটি নতুন কোনো হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ভুল বোঝার সুযোগ থাকে। বাস্তবে নতুন কোনো হত্যাচেষ্টার খবর নয়, বরং অতীতের ঘটনাগুলো স্মরণ করে ট্রাম্পের দেওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্যই এটি। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর