জর্জিয়ায় স্বদেশফেরার উৎসবে বন্দুক হামলা, নিহত ২ আহত ৩৫
জর্জিয়ার ভিয়েনায় স্বদেশফেরার উৎসব ঘিরে ভয়াবহ গুলিতে দুই তরুণ নিহত, আহত ৩৫; হাজারো মানুষের ভিড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শহরে।
জর্জিয়ায় স্বদেশফেরার উৎসবে বন্দুক হামলা, নিহত ২ আহত ৩৫
জর্জিয়ার ভিয়েনায় স্বদেশফেরার উৎসবে ভয়াবহ বন্দুক হামলায় দুই তরুণ নিহত এবং অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় ও রাজ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রোববার ভোররাতে এক বিশাল জনসমাগমের মধ্যে একাধিক স্থানে গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে তখন এক হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণে অবস্থান করছিলেন। তবু তাদের উপস্থিতির মধ্যেই আবার গুলির শব্দ শোনা যায়।
ঘটনাটি ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডুলি কাউন্টির ভিয়েনা শহরে। জর্জিয়া তদন্ত ব্যুরোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রোববার রাত পেরিয়ে ভোররাত প্রায় ১টা ২৫ মিনিটে পাইন স্ট্রিটের একটি আবাসিক এলাকায় গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ওই এলাকায় স্বদেশফেরার সপ্তাহান্ত উপলক্ষে একটি অনানুষ্ঠানিক রাস্তার উৎসব চলছিল। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।
স্থানীয় শেরিফ ক্রেগ পিভির বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে কমপক্ষে ৫০টি গুলি ছোড়া হয়। গুলিবর্ষণের ঘটনা অন্তত দুটি স্থানে ঘটে, যেগুলোর মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় এক ব্লক। অর্থাৎ ঘটনাটি একটি মাত্র স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যরা একটি স্থানে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করার সময় কাছাকাছি আরেক স্থান থেকেও গুলির শব্দ আসে।
গুলির শব্দ শুরু হওয়ার পর উৎসবে থাকা মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে চারদিকে ছুটতে শুরু করেন। প্রত্যক্ষ পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে শেরিফ ক্রেগ পিভি জানান, মানুষ তখন যে যেদিকে পারছিলেন সেদিকে দৌড়াচ্ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যরা ঘটনাস্থলে থাকা অবস্থাতেও কাছাকাছি আরেক জায়গা থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। পরিস্থিতি এতটাই অনিশ্চিত ছিল যে গুলি কোন দিক থেকে আসছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘটনায় দুই তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। ডুলি কাউন্টির করোনার ব্রেট ওয়ালস নিশ্চিত করেছেন, নিহত দুজনের একজনের বয়স ২০ বছর এবং অন্যজনের বয়স ২৩ বছর। তাদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাদের মরদেহ পরবর্তী পরীক্ষার জন্য জর্জিয়া তদন্ত ব্যুরোর চিকিৎসা পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। মৃত্যুর সঠিক পরিস্থিতি এবং গুলিবর্ষণের সঙ্গে নিহতদের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছেন।
আহত মানুষের সংখ্যাও অনেক বেশি। জর্জিয়া তদন্ত ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে আহত ৩৫ জনের সবাই গুলিতে আহত হয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কর্তৃপক্ষ বলেছে, কয়েকজন মানুষ গুলি থেকে বাঁচতে দৌড়ানোর সময়ও আহত হন। ফলে আহতদের সংখ্যা শুধু গুলিবিদ্ধ মানুষের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, আহতদের মধ্যে অন্তত ২৫ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আশপাশের একাধিক চিকিৎসাকেন্দ্রে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক আহত মানুষ একসঙ্গে হাসপাতালে পৌঁছানোর কারণে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়। ডুলি কাউন্টির করোনার ব্রেট ওয়ালস ঘটনাস্থলের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন এবং জানান, আহতদের নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ব্যাপক ব্যস্ততা তৈরি হয়েছিল।
ঘটনাটি ডুলি কাউন্টি উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বদেশফেরার সপ্তাহান্তের সঙ্গে একই সময়ে ঘটলেও এটি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। বিদ্যালয় ব্যবস্থার তত্ত্বাবধায়ক শেরড উইলাফোর্ড জানিয়েছেন, ওই ঘটনার প্রভাব শিক্ষার্থী, পরিবার ও কর্মীদের ওপর পড়তে পারে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরবর্তী কার্যদিবসে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার কথা জানিয়েছে, তবে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ভিয়েনা শহরের মেয়র এডি ড্যানিয়েলসও ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, তার বাড়ি থেকে প্রায় এক ব্লক দূরে গুলির ঘটনা ঘটে এবং তিনি প্রচুর পুলিশের আলো দেখতে পান। তবে ঘটনার সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাননি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শহর কর্তৃপক্ষ ওই রাস্তার উৎসবের জন্য কোনো অনুমতিপত্র দিয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মেয়র বলেছেন, শহর থেকে এমন কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং অনুষ্ঠানটি সত্যিই স্বদেশফেরার অনুষ্ঠান ছিল কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না।
ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব এখন জর্জিয়া তদন্ত ব্যুরো স্থানীয় শেরিফ কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালনা করছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পরীক্ষা করছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং গুলিবর্ষণের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি। একই সঙ্গে গুলিবর্ষণের উদ্দেশ্য বা এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট বিরোধ কাজ করেছিল কি না, সেটিও এখনো জানা যায়নি।
তদন্তকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, এত বড় জনসমাগমের মধ্যে কীভাবে একাধিক স্থানে গুলিবর্ষণ ঘটল এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তা নির্ধারণ করা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং বিভিন্ন স্থানে ছোড়া গুলির তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারা জনগণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহেরও চেষ্টা করছেন।
ভিয়েনা জর্জিয়ার তুলনামূলকভাবে ছোট একটি শহর। আটলান্টা থেকে শহরটি প্রায় ১৩০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এমন একটি ছোট শহরে এক হাজারের বেশি মানুষের সমাগমের মধ্যে এত বড় বন্দুক হামলার ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ডুলি কাউন্টির করোনার ব্রেট ওয়ালসও বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা সাধারণত বড় শহরের খবর হিসেবে মানুষ শুনে থাকে, কিন্তু ছোট একটি শহরে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটায় স্থানীয় সম্প্রদায় ব্যাপকভাবে হতবাক।
এদিকে তদন্ত চলতে থাকায় কর্তৃপক্ষ গুজব বা যাচাই না করা তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। নিহতদের পরিচয়, আহতদের সুনির্দিষ্ট অবস্থা, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পরিচয় এবং গুলিবর্ষণের কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে না।
সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েনার ওই ভয়াবহ ঘটনায় দুই তরুণ নিহত, ৩৫ জন আহত এবং অন্তত ২৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এক হাজারের বেশি মানুষের সমাগমে কমপক্ষে ৫০টি গুলি ছোড়া হয়েছিল এবং ঘটনাটি অন্তত দুটি কাছাকাছি স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও গুলিবর্ষণ চলতে থাকায় পুরো ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্য ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
ফ্যাক্ট যাচাইয়ের ফলাফল হলো, আপনার দেওয়া মূল তথ্যের বেশিরভাগই নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে মিলে গেছে। তবে “৫০ জনের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল” বলা বিভ্রান্তিকর। নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে ৫০টি গুলি ছোড়া হয়েছিল। একইভাবে আহত ৩৫ জনের সবাই গুলিবিদ্ধ ছিলেন এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়। আর ঘটনাটি স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বদেশফেরার সপ্তাহান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এটি বিদ্যালয়ের আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল না।