ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বর্ণবাদ বলায় ব্রিটেনে নতুন রাজনৈতিক ঝড়
গ্রিন পার্টির ইসরায়েল নীতি নিয়ে বিতর্কিত ভোটে লেবার তীব্র সমালোচনা করেছে, ইহুদি অধিকার ও দুইরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে ব্রিটেনে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে।
ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বর্ণবাদ বলায় ব্রিটেনে নতুন রাজনৈতিক ঝড়
ব্রিটেনে ইসরায়েল ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে নতুন করে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গ্রিন পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে সদস্যরা ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বর্ণবাদ হিসেবে বিবেচনা করার নীতির পক্ষে ভোট দেওয়ার পর দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লেবার পার্টি এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছে এবং দলটির নেতৃত্বকে অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছে।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত গ্রিন পার্টির সম্মেলনে বিতর্কিত প্রস্তাবটি ১ হাজার ২২ ভোটের বিপরীতে ৮১৩ ভোটে অনুমোদিত হয়। অর্থাৎ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে বিপক্ষের চেয়ে ২০৯টি বেশি। এর মাধ্যমে গ্রিন পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে এমন একটি নীতি গ্রহণ করেছে, যেখানে ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে অন্য যেকোনো ধরনের বর্ণবাদের মতো বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের পুরো ভূখণ্ডজুড়ে জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি একক গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন জানানো হয়েছে। গ্রিন পার্টির গৃহীত অবস্থানে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, প্রত্যাবর্তনের অধিকার এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র বিক্রি বন্ধসহ আরও কয়েকটি দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পর লেবার পার্টির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। লেবার পার্টির চেয়ার ও নারী এবং সমতা বিষয়ক মন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসন বলেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারকে সমর্থনকারী ব্রিটিশ ও বিশ্বের বিপুলসংখ্যক ইহুদিকে বর্ণবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা লজ্জাজনক। তিনি গ্রিন পার্টির নেতৃত্বকে এই অবস্থান ভবিষ্যতে তাদের দলীয় নীতি হিসেবে থাকবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। সমসাময়িক প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের এই অংশগুলো প্রকাশিত হয়েছে।
ফিলিপসনের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, তিনি ইসরায়েলি সরকারের নীতির সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষকে এক বিষয় হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েল সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা নিজে থেকে ইহুদিবিদ্বেষ নয়। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, গ্রিন পার্টির সাম্প্রতিক ভোট সেই সীমা অতিক্রম করেছে, যেখানে রাজনৈতিক মতবিরোধ আর শুধু ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েলি সরকারের নীতির সমালোচনা এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে একই বিষয় হিসেবে দেখা উচিত কি না, তা নিয়ে ব্রিটেনে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক রয়েছে। গ্রিন পার্টি বলছে, তাদের অবস্থান ইহুদি জনগণের বিরুদ্ধে নয়। বরং তারা ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা করছে এবং ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
গ্রিন পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলটি সব ধরনের বর্ণবাদের বিরোধী এবং ইহুদি ও ফিলিস্তিনি উভয় জনগোষ্ঠীর সমান অধিকারকে সমর্থন করে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের সদস্যদের মধ্যে এ বিষয়ে গভীর ও আবেগপূর্ণ বিতর্ক হয়েছে এবং সম্মেলন শেষ পর্যন্ত নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটি একই সঙ্গে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবিকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে গ্রিন পার্টির ভেতরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর বিভাজন রয়েছে। দলটির পাঁচজন সংসদ সদস্যের মধ্যে চারজন প্রকাশ্যে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন বলে একাধিক প্রতিবেদন জানিয়েছে। সাবেক দলীয় নেতা কার্লা ডেনিয়ার ও অ্যাড্রিয়ান রামসে এর বিরোধিতা করেছেন। দলের সহকারী নেত্রী র্যাচেল মিলওয়ার্ডও প্রস্তাবটির মূল ভাষাকে সমস্যাজনক বলে মন্তব্য করেছিলেন।
গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি ভোটে অংশ নেননি। তিনি শুক্রবার সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার পর ব্রাইটন ছেড়ে হলবর্ন ও সেন্ট প্যানক্রাসের উপনির্বাচনের প্রচারে চলে যান। ফলে বিতর্কিত প্রস্তাবের চূড়ান্ত ভোটের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
পোলানস্কির অবস্থানও এ বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ইহুদি জনগণের অধিকার এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখা উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য নিয়ে গ্রিন পার্টির মধ্যেই মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
ইহুদি সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়াও তীব্র। মুভমেন্ট ফর প্রগ্রেসিভ জুডাইজম এবং অন্যান্য ইহুদি সংগঠন গ্রিন পার্টির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, এই নীতি ব্রিটিশ সমাজে ইহুদিদের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক ও জাতীয় পরিচয়কে অগ্রাহ্য করে এবং ইহুদি সদস্যদের জন্য দলটির ভেতরে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে গ্রিন পার্টির সমর্থকদের একটি অংশ বলছে, ইহুদিবিদ্বেষের বিরোধিতা করা এবং ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা করা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। তাদের যুক্তি হলো, একটি রাষ্ট্রের সরকারি নীতি, সামরিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনা কোনো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সমান নয়।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রিটেনের সম্ভাব্য আইনি প্রশ্ন। কিছু আইন বিশেষজ্ঞের মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে বৈষম্যের শিকার করার মতো নীতি গ্রহণ করা হলে তা সমতা আইনের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে। গ্রিন পার্টির গৃহীত প্রস্তাব ভবিষ্যতে দলীয় সদস্যদের ওপর কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েল সরকারও এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, গ্রিন পার্টির এই অবস্থান ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অস্বীকার করে। অন্যদিকে গ্রিন পার্টি বলছে, তাদের লক্ষ্য ইহুদিদের অধিকার অস্বীকার করা নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
এই বিতর্ক ব্রিটিশ রাজনীতিতে আরও বড় রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ গ্রিন পার্টি সাম্প্রতিক সময়ে ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং লেবার পার্টির বামঘেঁষা ভোটারদের একটি অংশকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করছে। ফলে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, গাজা এবং ইহুদি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে দলটির অবস্থান ভবিষ্যৎ নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো গ্রিন পার্টি এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে বাস্তব রাজনৈতিক নীতিতে রূপ দেবে। শুধু ইসরায়েলি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আর ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব নিয়ে অবস্থান নেওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে। একইভাবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থন করা এবং ব্রিটিশ ইহুদিদের রাজনৈতিক পরিচয়কে বর্ণবাদ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।