তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ মামলা, গুরুত্বপূর্ণ শুনানি শুরু সুপ্রিম কোর্টে
জলবায়ু বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ কে দেবে, তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে বড় মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে শুরু হলো গুরুত্বপূর্ণ শুনানি।
তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ মামলা, গুরুত্বপূর্ণ শুনানি শুরু সুপ্রিম কোর্টে
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সোমবার, ৫ অক্টোবর, নতুন বিচারবর্ষ শুরু করছে। নতুন এই বিচারবর্ষের প্রথম দিনেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু মামলা শুনানি হচ্ছে, যার প্রভাব শুধু কলোরাডো নয়, দেশজুড়ে জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের করা বহু মামলার ওপর পড়তে পারে।
মামলাটি করেছে কলোরাডোর বোল্ডার শহর ও বোল্ডার কাউন্টি। তাদের অভিযোগ, এক্সনমোবিল ও সানকর এনার্জি দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সৃষ্ট জলবায়ু ঝুঁকি সম্পর্কে জানত এবং সেই ঝুঁকি নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ রাখতে চায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, কেন্দ্রীয় আইন কি বোল্ডারের মতো স্থানীয় সরকারকে অঙ্গরাজ্যের আদালতে জ্বালানি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ থেকে বিরত রাখে কি না। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি বিক্রি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে অঙ্গরাজ্যের আইনের অধীনে ক্ষতিপূরণ চাওয়া যাবে কি না, সেটিই মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বোল্ডার কর্তৃপক্ষের মামলা প্রথমে ২০১৮ সালে করা হয়েছিল। পরে কলোরাডোর সর্বোচ্চ আদালত মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়। এর বিরুদ্ধে এক্সনমোবিল ও সানকর এনার্জি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করে।
জ্বালানি কোম্পানিগুলোর অবস্থান হলো, জলবায়ু পরিবর্তন একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়। তাই কোনো একটি অঙ্গরাজ্য বা স্থানীয় সরকার নিজেদের আইনের মাধ্যমে এমন বিষয়ে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা চালাতে পারে না। তাদের যুক্তি, কেন্দ্রীয় পরিবেশ আইনই এ ধরনের বিষয়ে প্রধান আইনি কাঠামো তৈরি করেছে।
অন্যদিকে বোল্ডার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, স্থানীয় জনগণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তব ক্ষতির মুখে পড়ছে। বন্যা, দাবানল, অতিরিক্ত তাপ, অবকাঠামো ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্থানীয় সরকারের ব্যয় বাড়ছে। সেই ক্ষতির পুরো বোঝা শুধু করদাতাদের ওপর চাপানো উচিত নয় বলে তারা মনে করে।
এই মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকার জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা করেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০টি অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারের জলবায়ু দায়বদ্ধতা মামলা রয়েছে বা এ ধরনের মামলা নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। সুপ্রিম কোর্ট যদি জ্বালানি কোম্পানিগুলোর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে এসব মামলার অনেকগুলোই বাধাগ্রস্ত বা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে আদালতের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে। মামলাটি এখনো চূড়ান্ত রায়ে পৌঁছায়নি। ফলে সুপ্রিম কোর্ট আদৌ এই পর্যায়ে মামলাটির মূল বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রাখে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে পারে। আদালত ইতোমধ্যে দুই পক্ষের আইনজীবীদের কাছে এই এখতিয়ারসংক্রান্ত বিষয়েও মতামত চেয়েছে।
মামলায় বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো অংশ নিচ্ছেন না। তিনি তেল ও গ্যাস কোম্পানির শেয়ারের মালিক হওয়ায় নিজেকে এই মামলা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। ফলে আদালতের ভোট যদি সমানভাবে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। চার-চার ভোটে সমতা হলে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকতে পারে, তবে সেটি দেশব্যাপী বাধ্যতামূলক নতুন নজির তৈরি করবে না।
সুপ্রিম কোর্টের নতুন বিচারবর্ষে শুধু জলবায়ু মামলাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি, বন্দীদের জামিন শুনানির অধিকার, তৃতীয় দেশে অভিবাসীদের পাঠানো, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটাধিকারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মামলাও সামনে রয়েছে।
অভিবাসনসংক্রান্ত মামলাগুলোর একটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন এমন নীতি অনুসরণ করছে, যার অধীনে নির্বাসন প্রক্রিয়ায় থাকা কিছু অভিবাসীকে জামিন শুনানির সুযোগ না দিয়েই আটক রাখা হতে পারে। সরকার ১৯৯৬ সালের অভিবাসন আইনের একটি বিধানের ওপর নির্ভর করছে। বিপরীতে অভিবাসন অধিকারকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় আটক রাখার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও জামিনের সুযোগ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বড় মামলা আসছে। অঙ্গরাজ্যগুলো সামরিক ধাঁচের আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিষিদ্ধ করতে পারে কি না, সেটি আদালতের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে রয়েছে। এই মামলার রায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এবারের বিচারবর্ষে আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ছয়জন রক্ষণশীল ও তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি রয়েছেন। ফলে অভিবাসন, অস্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং পরিবেশের মতো বিতর্কিত বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও সরকারি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বোল্ডারের জলবায়ু মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী বছরের জুনের মধ্যে আসতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে আদালত মামলাটি কোন পথে এগিয়ে নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন নয়, এই রায়ের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বনাম কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার সীমা এবং বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর আইনি দায়বদ্ধতার ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হতে পারে।