যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের জন্য ছয় পেশায় ক্যারিয়ারের সুযোগ, প্রশিক্ষণেই মিলতে পারে নতুন চাকরি

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের জন্য ছয় পেশায় নতুন ক্যারিয়ার সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতায় মিলতে পারে ভালো বেতন এবং ভবিষ্যতের চাকরি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের জন্য ছয় পেশায় ক্যারিয়ারের সুযোগ, প্রশিক্ষণেই মিলতে পারে নতুন চাকরি

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের জন্য ছয় পেশায় ক্যারিয়ারের সুযোগ, প্রশিক্ষণেই মিলতে পারে নতুন চাকরি


যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিংবা দেশটিতে নতুন করে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও তথ্য বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন খাতে কাজের সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের কর্মসংস্থান পূর্বাভাসে এমন কয়েকটি পেশার কথা উঠে এসেছে, যেগুলোতে আগামী বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা, সাইবার নিরাপত্তা, রক্ত সংগ্রহকারী, নার্সিং সহকারী, বাণিজ্যিক ট্রাক চালনা এবং তথ্যবিজ্ঞান বা তথ্য বিশ্লেষণ-সংশ্লিষ্ট কাজ। তবে এসব পেশার ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি—শুধু প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেই চাকরি নিশ্চিত হয় না। পেশাভেদে শিক্ষাগত যোগ্যতা, লাইসেন্স, সনদ, কাজের অভিজ্ঞতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তাকে প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কম্পিউটার সহায়তা বিশেষজ্ঞদের কাজের মধ্যে কম্পিউটার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এবং ব্যবহারকারীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া অন্যতম। তবে শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই পেশায় সামগ্রিক কর্মসংস্থান প্রায় ৩ শতাংশ কমতে পারে। তারপরও কর্মী পরিবর্তন ও অন্যান্য কারণে বছরে গড়ে প্রায় ৪৮ হাজার ৭০০টি চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু সাধারণ প্রযুক্তিগত সহায়তার দক্ষতার পরিবর্তে নেটওয়ার্কিং, ক্লাউড প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তার মতো অতিরিক্ত দক্ষতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে সুযোগ বাড়তে পারে।

প্রযুক্তি খাতের দ্রুত বাড়তে থাকা ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো সাইবার নিরাপত্তা। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, তথ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক পেশায় ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর্মসংস্থান ২১ শতাংশ বাড়তে পারে। বছরে গড়ে প্রায় ১৪ হাজার ১০০টি চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে এই পেশার মধ্যম বার্ষিক বেতন ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ১৮০ ডলার।

তবে এই পেশায় সরাসরি প্রবেশের জন্য সাধারণত কম্পিউটার বা তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং সম্পর্কিত কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদি কোর্স করেই সরাসরি সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক হওয়া সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা, নেটওয়ার্কিং কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ধাপে ধাপে এই খাতে প্রবেশ করা অনেকের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে রক্ত সংগ্রহকারী পেশায়। এ পেশায় কর্মরতরা রোগী বা রক্তদাতার কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করেন এবং পরীক্ষার জন্য নমুনা প্রস্তুত করেন। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, সাধারণত মাধ্যমিক-পরবর্তী রক্ত সংগ্রহ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই পেশায় প্রবেশ করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিক সনদ ও কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও সুযোগ থাকতে পারে।

২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে রক্ত সংগ্রহকারীদের কর্মসংস্থান ৭ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এ সময়ে বছরে গড়ে প্রায় ১৮ হাজার চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। ২০২৫ সালের মে মাসে এ পেশার মধ্যম বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৪৫ হাজার ২৩০ ডলার। তবে কোন অঙ্গরাজ্যে কাজ করা হবে, তার ওপর সনদ বা অন্যান্য শর্ত ভিন্ন হতে পারে।

নার্সিং সহকারী পেশাটিও বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র হতে পারে। নার্সিং সহকারীরা রোগীদের দৈনন্দিন মৌলিক কাজে সহায়তা করেন। হাসপাতাল, নার্সিং কেয়ার ফ্যাসিলিটি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের কাজের সুযোগ রয়েছে।

শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে নার্সিং সহকারী ও ওয়ার্ড সহকারীদের মিলিয়ে বছরে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ৩০০টি চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সময়ে কর্মসংস্থান প্রায় ৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নার্সিং সহকারীদের মধ্যম বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৪২ হাজার ২৬০ ডলার।

অনেক অঙ্গরাজ্যে নার্সিং সহকারী হিসেবে কাজ করার আগে অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন এবং দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ফলে বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রশিক্ষণে ভর্তি হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নিয়ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

পরিবহন খাতেও রয়েছে বড় কর্মসংস্থানের বাজার। বিশেষ করে ভারী ট্রাক ও ট্রেইলার চালকদের চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। ভারী ও ট্রেইলার ট্রাক চালক পেশায় ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর্মসংস্থান ৪ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো।

এই পেশায় বছরে গড়ে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৫০০টি চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারী ট্রাক ও ট্রেইলার চালকদের মধ্যম বার্ষিক বেতন ছিল ৫৮ হাজার ৬৪০ ডলার। সাধারণত পেশাদার ট্রাক চালনা প্রশিক্ষণ এবং বাণিজ্যিক চালকের লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। বয়স, ড্রাইভিং রেকর্ড, চিকিৎসাগত যোগ্যতা ও লাইসেন্সের ধরনসহ বিভিন্ন শর্তও প্রযোজ্য হতে পারে।

অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত ও প্রযুক্তি-দক্ষ বাংলাদেশিদের জন্য তথ্যবিজ্ঞান এবং তথ্য বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ক্যারিয়ার ক্ষেত্র হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বড় তথ্যভাণ্ডার এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবহার বাড়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তথ্য বিশ্লেষণের গুরুত্বও বাড়ছে।

শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, তথ্যবিজ্ঞানী পেশায় ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর্মসংস্থান ৩৫ শতাংশ বাড়তে পারে। বছরে গড়ে প্রায় ২৪ হাজার ৮০০টি চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে তথ্যবিজ্ঞানীদের মধ্যম বার্ষিক বেতন ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ২৩০ ডলার।

এই পেশায় সাধারণত গণিত, পরিসংখ্যান, কম্পিউটার বিজ্ঞান বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন হয়। কিছু ক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রিও প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করে সরাসরি তথ্যবিজ্ঞানী পদে চাকরি পাওয়া সহজ নয়। তবে হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার, তথ্যভাণ্ডার ব্যবস্থাপনা, প্রোগ্রামিং, পরিসংখ্যান, তথ্যচিত্রায়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত দক্ষতা অর্জন করলে তথ্য-সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রাথমিক পদে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ক্যারিয়ার শুরু করতে চাইলে প্রথমেই পেশা নির্বাচন না করে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পূর্বের কাজের অভিজ্ঞতা, ইংরেজি দক্ষতা, আর্থিক সামর্থ্য এবং বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর যে অঙ্গরাজ্যে বসবাস বা কাজের পরিকল্পনা রয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট পেশার লাইসেন্স ও সনদের নিয়ম যাচাই করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর চাকরির পূর্বাভাস পুরো যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের চিত্র তুলে ধরে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কত দ্রুত চাকরি পাবেন বা কত বেতন পাবেন, তা নির্ভর করবে তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, অবস্থান, নিয়োগদাতা এবং সংশ্লিষ্ট পেশার স্থানীয় চাহিদার ওপর।

তাই বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে কোর্সের স্বীকৃতি, অঙ্গরাজ্যের লাইসেন্সিং নিয়ম, সম্ভাব্য বেতন, স্থানীয় চাকরির চাহিদা এবং নিয়োগদাতাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা যাচাই করা সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

প্রযুক্তি খাতে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যবিজ্ঞানে দ্রুত কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা ও ট্রাক পরিবহন খাতে তুলনামূলকভাবে বিপুল সংখ্যক বার্ষিক চাকরির সুযোগ রয়েছে। ফলে নিজের যোগ্যতা ও লক্ষ্য অনুযায়ী সঠিক পেশা নির্বাচন করে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জন করলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর