শিকড় বাংলাদেশে, সাফল্যের গল্প আমেরিকায়—ত্রিশিতা মওলা

বাংলাদেশের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর এবার ঢাকায় মার্কিন মিশনের শীর্ষ নেতৃত্ব। ত্রিশিতা মওলার ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের অনুপস্থিতিতে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে ৫ লাখ পরীক্ষার কিট হস্তান্তরসহ জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

শিকড় বাংলাদেশে, সাফল্যের গল্প আমেরিকায়—ত্রিশিতা মওলা

শিকড় বাংলাদেশে, সাফল্যের গল্প আমেরিকায়—ত্রিশিতা মওলা


ঢাকায় মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের নেতৃত্বে এখন ত্রিশিতা মওলা। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের অনুপস্থিতিতে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন এই দায়িত্বে আসার পরপরই জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মার্কিন মিশনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও পালন করছেন।

ত্রিশিতা মওলার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে তাঁর বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট পরিচয় এবং মার্কিন কূটনীতিক হিসেবে দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার কারণে। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনের শীর্ষ দায়িত্বে তাঁর উপস্থিতি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন মার্কিন কূটনীতিকের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে।

সম্প্রতি ঢাকায় তাঁর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ১ অক্টোবর কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৫ লাখ ডেঙ্গু এনএস১ দ্রুত শনাক্তকরণ পরীক্ষার কিট হস্তান্তর করেন ত্রিশিতা মওলা। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে Strengthening Responses to Infectious Diseases and Epidemics বা STRIDES কর্মসূচির মাধ্যমে এসব কিট দেওয়া হয়।

এই সহায়তা শুধু আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কিট হস্তান্তরের পর হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষাগার পরিদর্শন করা হয়। সেখানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা, রোগ শনাক্তকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সরেজমিনে খোঁজ নেওয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিটগুলো প্রথমে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে জমা হবে এবং পরে প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হবে।

স্বাস্থ্য খাতে এই সহযোগিতার সময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার কিট ও চিকিৎসাসামগ্রী রয়েছে। নতুন করে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ৫ লাখ কিট চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ডেঙ্গু টিকা চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে এবং এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ত্রিশিতা মওলার বর্তমান দায়িত্ব তাই কেবল দূতাবাসের প্রশাসনিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের প্রতিনিধিত্ব করা, বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং দুই দেশের সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র এগিয়ে নেওয়াও তাঁর দায়িত্বের অংশ।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতার পরিধি বর্তমানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। চলতি বছর মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে একাধিকবার কথা বলেছেন। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টি তাঁর বিভিন্ন আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নতুন নয়। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বাস্থ্য খাত শক্তিশালী করার জন্য ২৪ লাখ ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জাম সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিল। ডেঙ্গু পরীক্ষার নতুন এই কিট সহায়তা সেই বৃহত্তর স্বাস্থ্য সহযোগিতার ধারাবাহিকতার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর আগে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, রেল যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন। জুনে তাঁর নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে সামরিক পর্যায়ে সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় নিয়ে আলোচনা হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও চলতি বছর ঢাকা-ওয়াশিংটনের যোগাযোগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার হওয়ায় বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক করার বিষয়ে মার্কিন পক্ষ গুরুত্ব দিয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ত্রিশিতা মওলার নেতৃত্বের সময়টি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক সহযোগিতাও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

ত্রিশিতা মওলার দায়িত্ব পালনের প্রথম দিকের কার্যক্রমে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। ৫ লাখ ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট হস্তান্তর এবং হাসপাতালের ডেঙ্গু চিকিৎসা ও পরীক্ষাগার পরিদর্শনের মাধ্যমে তিনি মাঠপর্যায়ের সহযোগিতার একটি দিক সামনে এনেছেন। এর ফলে ঢাকায় মার্কিন মিশনের কূটনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সহযোগিতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় দায়িত্ব নিতে আসেন এবং নিজেকে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে পরিচয় দেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন।

বর্তমানে তাঁর অনুপস্থিতিতে ত্রিশিতা মওলা ঢাকায় মার্কিন মিশনের দৈনন্দিন নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে তাঁর বর্তমান ভূমিকা একই সঙ্গে প্রশাসনিক, কূটনৈতিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক ডেঙ্গু সহায়তা সেই দায়িত্বের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন মার্কিন কূটনীতিক হিসেবে ত্রিশিতা মওলার ঢাকায় এই দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজের জন্যও আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। তবে তাঁকে ঢাকায় মার্কিন মিশনের ‘প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রধান’ হিসেবে উল্লেখ করার আগে মার্কিন দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক জীবনী বা সরকারি নথি থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্তমানে পাওয়া নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে তাঁর চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ডেঙ্গু কিট হস্তান্তরের তথ্য নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে ঢাকায় ত্রিশিতা মওলার বর্তমান দায়িত্বের শুরুতেই যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে কূটনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সহযোগিতা অন্যতম। ৫ লাখ ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট হস্তান্তর, হাসপাতাল পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্কিন মিশনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তাঁর নতুন ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। সামনে তাঁর নেতৃত্বে স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কী ধরনের কার্যক্রম আরও দৃশ্যমান হয়, সেটিই এখন নজরে রাখার বিষয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর