ইরান যুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্র ভাবনায় বহু দেশ, সতর্ক করলেন মেদভেদেভ
ইরান সংঘাতের পর পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চিন্তা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ।
ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। ৩ অক্টোবর ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তনের চেষ্টা এবং দেশটিকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দুর্বল করার প্রচেষ্টা উল্টো আরও বেশি রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়টি বিবেচনা করতে প্ররোচিত করতে পারে।
মেদভেদেভের বক্তব্যটি রুশ সংবাদ সংস্থা তাসসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে অনেক দেশের আলোচনা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত ও তাত্ত্বিক। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের পর পরিস্থিতি বদলেছে বলে তিনি মনে করেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ভবিষ্যতে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। মেদভেদেভ বলেননি যে বহু দেশ ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল সম্ভাবনা ও প্রবণতা নিয়ে। তিনি আশঙ্কা করেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্র ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকতে পারে। ফলে এটিকে নিশ্চিত পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার খবর হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।
মেদভেদেভ আরও দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও এর সামরিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। এই মন্তব্য অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন। এটিকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখানো যাবে না। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু বছর ধরে তদন্ত, পরিদর্শন, বিরোধ এবং কূটনৈতিক আলোচনা চলে আসছে।
রুশ কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাঁর কাছে এমন একটি বার্তা তৈরি করেছে যে পারমাণবিক অস্ত্র একটি রাষ্ট্রকে বড় ধরনের সংঘাত থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক্ষমতা দিতে পারে। তাঁর মতে, এই ধারণাই অন্য দেশগুলোকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে উৎসাহিত করতে পারে। তবে এটি মেদভেদেভের কৌশলগত বিশ্লেষণ; আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের আশঙ্কা অবশ্য ইরান সংকটের আগেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। কোনো একটি রাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রও একই পথে এগিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কাকে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। মধ্যপ্রাচ্যে এ ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিয়েও মেদভেদেভ কথা বলেছেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে এটিকে ইরানের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতার উৎস হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ককেও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য মেদভেদেভের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য চাপ। যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলেই বড় শক্তির সামরিক আক্রমণ ঠেকানো সম্ভব, তাহলে অন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও একই ধরনের চিন্তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা, ভুল হিসাব এবং সংঘাত আরও ভয়াবহ পর্যায়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে মেদভেদেভের বক্তব্যের পর বহু দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট দেশের সরকারও তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই খবরটির সবচেয়ে নির্ভুল উপস্থাপন হবে, ইরান সংঘাতের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে রাশিয়ার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্কবার্তা দিয়েছেন।




