ব্রেকিং
অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালুর সুপারিশে আপত্তি, জবাবদিহি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কযুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৩.৭ শতাংশে, পেট্রলের দাম এক মাসে বেড়েছে ৯.১ শতাংশসাবেক সিআইএ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির মামলা স্থগিত, এক বছর পর অভিযোগ প্রত্যাহারের শর্তসাহায্য চাওয়ার ছলে প্রবীণদের গয়না চুরি, চার অঙ্গরাজ্যে অভিযুক্ত রোমানীয় দম্পতিজেএফকে বিমানবন্দরে ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ, তীব্র নিন্দা জানালেন বিএনপির রুহুল কবির রিজভী

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরাকের সার্বভৌমত্ব বাড়লেও থাকছে ওয়াশিংটনের প্রভাব

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সুযোগ পেলেও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে রয়ে গেছে উদ্বেগ।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরাকের সার্বভৌমত্ব বাড়লেও থাকছে ওয়াশিংটনের প্রভাব
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরাকের সার্বভৌমত্ব বাড়লেও থাকছে ওয়াশিংটনের প্রভাব

 থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে দেশটির সামরিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দেশটির নিরাপত্তা, রাজনীতি ও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব রেখেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ মার্কিন সেনারা ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটি ত্যাগ করার পর দেশটির নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব এখন ইরাকি বাহিনীর ওপর বর্তেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের সম্পর্ক সামরিক নির্ভরতা থেকে নতুন ধরনের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে। 

ইরাকের জন্য এই প্রত্যাহার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার পতনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পরবর্তী সময়ে ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। ২০১১ সালে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে চলে গেলেও ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর আবার বড় আকারে ফিরে আসে। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে পরবর্তী ১২ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলোর সেনারা ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে। 

২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ও বাগদাদ সামরিক অভিযানের সমাপ্তির সময়সূচি নির্ধারণ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে ইরাকে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক অভিযান শেষ করার পর অবশিষ্ট উপস্থিতিও ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিনে ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর মাধ্যমে ইরাকে ইসলামিক স্টেটবিরোধী সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছে। 

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি এই পরিবর্তনকে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছেন। বাগদাদের দৃষ্টিতে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ায় দেশের ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই সুযোগ বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে ইরাকি সরকার দেশের ভেতরের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আনতে পারে তার ওপর। 

কারণ যুক্তরাষ্ট্র চলে গেলেও ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। ইসলামিক স্টেটের মূল ভূখণ্ডভিত্তিক শক্তি ব্যাপকভাবে ধ্বংস হলেও তাদের কিছু সদস্য ও নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়। পাশাপাশি ইরাকে ইরানঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। এসব গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে আনার বিষয়ে বাগদাদ দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে রয়েছে। নিরস্ত্রীকরণের নির্ধারিত সময়সীমাও ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রত্যাহারের পরবর্তী বড় প্রশ্নটি সামনে এসেছে। মার্কিন সেনা আর ইরাকে ঘাঁটি থেকে সরাসরি নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করবে না, কিন্তু ওয়াশিংটন দেশটির সঙ্গে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরাকি বাহিনীকে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ফলে সামরিক উপস্থিতির অবসান হলেও দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না। 

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা রয়েছে। ইরাকের রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ তেলনির্ভর হওয়ায় তেল বিক্রির বৈদেশিক অর্থ দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরাকের তেল বিক্রির বৈদেশিক অর্থ নিউইয়র্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এই কাঠামো ইরাকের অর্থকে সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধা দিলেও ওয়াশিংটনের হাতে বাগদাদের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করে। 

এ কারণে শুধু সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পুরোটা ধরা পড়বে না। সামরিক ক্ষেত্রে বাগদাদের স্বাধীনতা বাড়লেও অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন, নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনের জন্যও ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতির ধরন পরিবর্তনের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ঘাঁটি ও সেনা রেখে কাজ করার পরিবর্তে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে প্রভাব ধরে রাখার পথে এগোচ্ছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগভিত্তিক সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেছেন। 

তবে এই পরিবর্তনের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা চলছে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ইরানে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন। একই সঙ্গে কুর্দিস্তান অঞ্চলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর ইসলামিক স্টেটের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইরাকি ও কুর্দি বাহিনীকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। 

তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে একদিকে ইরাকের জন্য সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করার বড় সুযোগ হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। বিদেশি সেনা চলে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজেদের সক্ষমতায় দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার মতো পুরোনো সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হবে।

সব মিলিয়ে, ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। কিন্তু এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক থেকে সম্পূর্ণ বিদায় নয়। বরং সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠছে। ইরাক এখন যে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিসর পেয়েছে, সেটিকে কতটা কার্যকর সার্বভৌমত্বে রূপ দিতে পারে সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


প্রতিবেদক

CSB News USA

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।