যুক্তরাষ্ট্র-চীন শুল্ক কমানোর সমঝোতায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাল্টাপাল্টি ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনের নতুন ইঙ্গিত মিলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন শুল্ক কমানোর সমঝোতায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক কমানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। দুই দেশই একে অপরের কাছ থেকে আমদানি করা প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের অ-সংবেদনশীল পণ্যের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক শুল্কব্যবস্থার সুপারিশ করেছে। সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর প্রকাশিত পণ্যের তালিকা থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি সব ধরনের পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি কাঠামো ও তালিকা তৈরি হয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পুরোপুরি শুল্কযুদ্ধ শেষ করেছে’ এমন বক্তব্য সঠিক নয়। বাণিজ্য উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক বিরোধ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে চীনা পণ্যের যে তালিকা তৈরি হয়েছে, সেখানে মূলত সাধারণ ভোক্তাদের ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছোট গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, খেলনা, ছুটির মৌসুমের সাজসজ্জার সামগ্রী, শিশুদের ব্যবহারের কিছু পণ্য, খেলাধুলার সরঞ্জাম, মাছ ধরার সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য। এসব পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হলে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক ও ভোক্তাদের ওপর ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
অন্যদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের একটি অনেক বড় তালিকা শুল্ক সুবিধার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে। তালিকায় কৃষিপণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য, প্রসাধনী এবং চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। মোট তালিকায় প্রায় এক হাজার ৬১৯টি পণ্যশ্রেণি রয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের জন্য এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। চীন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের অন্যতম বড় বাজার হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুল্ক, বাজার প্রবেশাধিকার এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দুই দেশের কৃষি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কৃষিপণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানোর জন্য আলাদা একটি কর্মদলও গঠন করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য সয়াবিনকে নতুন শুল্ক-সুবিধার তালিকায় প্রত্যাশিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের মধ্যে পুরোপুরি সন্তুষ্টি তৈরি হয়নি। সয়াবিন রপ্তানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের কারণে বিষয়টি আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
নতুন সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দেশ নিজেদের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সরাসরি সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে পরিচালনার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক বৈঠকের পর দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যবিরতি আরও দুই মাস বাড়িয়ে আগামী বছরের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।
এই সমঝোতার পেছনে দুই দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থও কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের প্রবেশাধিকার ধরে রাখার পাশাপাশি কৃষি, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগ্রহী। ফলে উভয় পক্ষই এমন কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতার পথ খুঁজছে, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা বা কৌশলগত প্রযুক্তির প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম জটিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত খাতগুলো এখনো আলোচনার বাইরে রয়েছে। অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, বিরল খনিজ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এসব বিষয়ে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য সম্পর্ককে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলা কঠিন।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিবর্তন না আনলেও ব্যবসা ও বাজারের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর ব্যবসা, খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের জন্য এটি কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কাও সাময়িকভাবে কমতে পারে।
সাম্প্রতিক কয়েক বছরের বাণিজ্য সংঘাত বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থা, পণ্যের মূল্য এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নতুন সমঝোতা সেই অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর না করলেও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নিয়মিত আলোচনার কাঠামো তৈরির দিকে এগোচ্ছে।