গোলান সিরিয়ারই থাকবে, ইসরায়েলকে কঠোর বার্তা দিলেন প্রেসিডেন্ট আল-শারা
জাতিসংঘে গোলান মালভূমির ওপর সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন আল-শারা।
গোলান সিরিয়ারই থাকবে, ইসরায়েলকে কঠোর বার্তা দিলেন প্রেসিডেন্ট আল-শারা
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গোলান মালভূমিকে সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতার সমালোচনা করে সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির বিপরীতে, সিরিয়া এখনই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে আল-শারা বলেন, গোলান মালভূমি সিরিয়ার ভূখণ্ড হিসেবেই থাকবে। তিনি ইসরায়েলের ১৯৮১ সালের গোলান সংযুক্তিকরণের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেন এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৯৭ নম্বর প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন। ওই প্রস্তাবে গোলানে ইসরায়েলের আইন, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ ও অকার্যকর বলা হয়েছিল।
আল-শারার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ১৯৭৪ সালের ইসরায়েল-সিরিয়া বিচ্ছিন্নীকরণ চুক্তি। তিনি এই চুক্তির প্রতি সিরিয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ইসরায়েলি বাহিনীকে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বরের আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। ওই চুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যে একটি নিরস্ত্রীকরণ ও বিচ্ছিন্নীকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক বাহিনী সেখানে দায়িত্ব পালন করে আসছে।
সিরিয়ার বর্তমান অবস্থানকে তাই সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দামেস্ক একদিকে গোলান মালভূমির ওপর নিজেদের ঐতিহাসিক ও আইনগত দাবি ধরে রেখেছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সমঝোতার পথও পুরোপুরি বন্ধ করেনি। এর আগে আল-শারা জানিয়েছিলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে সিরিয়া আগ্রহী এবং এমন একটি সমঝোতা ভবিষ্যতে বৃহত্তর শান্তির পথ তৈরি করতে পারে। তবে গোলান নিয়ে সিরিয়ার দাবি কোনোভাবেই ত্যাগ করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন।
গোলান মালভূমি নিয়ে বিরোধের ইতিহাস বহু দশকের। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েল সিরিয়ার কাছ থেকে গোলানের বড় অংশ দখল করে। পরে ১৯৮১ সালে ইসরায়েল সেখানে নিজেদের আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশ ওই পদক্ষেপকে স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৯৭ নম্বর প্রস্তাবও ইসরায়েলের সংযুক্তিকরণকে অবৈধ ঘোষণা করে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইসরায়েল সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায় এবং ১৯৭৪ সালের বিচ্ছিন্নীকরণ ব্যবস্থার আওতাধীন এলাকার কাছাকাছি ও বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। সিরিয়া এসব কর্মকাণ্ডকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক তদন্ত কমিশনও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি স্থল অভিযান, অভিযান পরিচালনা এবং সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। কমিশনের মতে, কিছু কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। ইসরায়েল অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সিরিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং তাদের কোনো ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্য নেই।
আগস্টেও সিরিয়ার একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলা দুই দেশের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। সিরিয়া ওই হামলাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করে। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করে, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
এদিকে সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দামেস্কের প্রধান দাবি হলো, ইসরায়েলি বাহিনীকে সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে সরিয়ে ১৯৭৪ সালের ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আবার সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সিরিয়ার ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।
আল-শারার সাম্প্রতিক বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, গোলান মালভূমি নিয়ে সিরিয়া কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। তিনি জাতিসংঘে স্পষ্ট করেছেন, গোলান সিরিয়ার ভূখণ্ড এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী কোনো সংযুক্তিকরণকে দামেস্ক মেনে নেবে না। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের অবসান এবং সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
তবে এই বক্তব্যকে “সিরিয়া সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে” হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। বরং বর্তমান বাস্তবতা হলো, গোলান ও দক্ষিণ সিরিয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, কিন্তু একই সময়ে নিরাপত্তা সমঝোতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও খোলা রয়েছে। আল-শারা নিজেও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
ফলে যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়া গোলান মালভূমির ওপর নিজেদের দাবি আরও জোরালো করেছে এবং ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে; কিন্তু গোলান দখলের চেষ্টা হলে অবিলম্বে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করবে এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সিরিয়া দেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটি তাই অতিরঞ্জিত। বর্তমান পরিস্থিতিকে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায় গোলানকে কেন্দ্র করে সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তীব্র হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।