ইরান যুদ্ধের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সেনা সমাবেশ, বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে তৃতীয় রণতরীসহ হাজারো সেনা পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন, হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তেজনা।

ইরান যুদ্ধের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সেনা সমাবেশ, বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা

ইরান যুদ্ধের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সেনা সমাবেশ, বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা


ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সামরিক শক্তি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর তেহরান সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক তৎপরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী বহর পাঠানো। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী থিওডোর রুজভেল্ট গত ২৭ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে যাত্রা করেছে। এর সঙ্গে রয়েছে যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান। একই সময়ে মেকিন আইল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন উভচর নৌবহরও মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে, যার সঙ্গে দুই হাজারের বেশি নৌসেনা রয়েছে। 

সাম্প্রতিক মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে পাঠানো সামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় নয় হাজার থেকে দশ হাজার হতে পারে। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি নৌসেনা রয়েছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ এই অতিরিক্ত বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। 

এই মোতায়েনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একই সময়ে তিনটি বিমানবাহী রণতরী বহর এবং দুটি উভচর নৌবহর থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইরানের বিরুদ্ধে আকাশ ও সমুদ্রপথে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সামরিক বিকল্প থাকবে। তবে এই সেনা সমাবেশকে সরাসরি স্থল অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। 

এদিকে ইরানের অবস্থানও কঠোর হচ্ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় শুধু মার্কিন সামরিক স্থাপনা নয়, যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা দেশগুলোর স্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু লক্ষ্যবস্তুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। 

তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির সবচেয়ে আলোচিত অংশটি নতুন নয়। জানুয়ারিতে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে সেটিকে সীমিত, ব্যাপক কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের অভিযান হিসেবে বিবেচনা না করে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে দেখা হবে এবং এর জবাব অত্যন্ত কঠোরভাবে দেওয়া হবে। ফলে ওই বক্তব্যকে বর্তমান পরিস্থিতির নতুন ঘোষণা হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। 

অন্যদিকে, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ক্যাম্প ডেভিডে কয়েক ঘণ্টা ধরে গোপন বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সভাপতিত্ব করার কথা জানা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেন। 

এক মার্কিন কর্মকর্তা বৈঠক সম্পর্কে বলেছেন, বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে অথবা অন্তত গভীরভাবে আলোচনা হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস বৈঠকে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করেনি। তাই ‘হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে’ এমন দাবি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। 

এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। তিনি ইরানের সাম্প্রতিক শান্তি প্রস্তাবকে যথেষ্ট নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং চুক্তি না হলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। 

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি নতুন মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার প্রমাণ নয়। তবে সামরিক প্রস্তুতি, অতিরিক্ত সেনা ও রণতরী মোতায়েন, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং ইরানের পাল্টা প্রস্তুতি সবকিছুই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে নভেম্বরের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি বাড়ালেও স্থল অভিযান বা নতুন সর্বাত্মক হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর