রুবিওর নির্দেশ অমান্য করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা দুই ইরানি কূটনীতিককে দেশছাড়া করা হলো

রুবিওর নির্দেশ অমান্য করায় জাতিসংঘ অধিবেশনে আসা দুই ইরানি প্রতিনিধিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, যা দেশের উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

রুবিওর নির্দেশ অমান্য করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা দুই ইরানি কূটনীতিককে দেশছাড়া করা হলো

রুবিওর নির্দেশ অমান্য করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা দুই ইরানি কূটনীতিককে দেশছাড়া করা হলো


যুক্তরাষ্ট্রে সদ্য শেষ হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধিদলের দুই সদস্যকে দেশটি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ওই দুই প্রতিনিধি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ পাওয়ার পরও নিউইয়র্কে অবস্থান করছিলেন। পরে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। 

ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং তাঁর প্রতিনিধিদলকে নিউইয়র্ক থেকে দ্রুত চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ইরানি প্রতিনিধিদলের কিছু সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। এ অবস্থানকে ওয়াশিংটন আর গ্রহণ করতে চায়নি। 

প্রথম দফায় দেওয়া নির্দেশের পর ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও তাঁর মূল প্রতিনিধিদল নিউইয়র্ক ত্যাগ করে। তবে পরবর্তীতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, প্রতিনিধিদলের আরও দুই সদস্য তখনও নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের আগের নির্দেশ অনুসরণ না করায় শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একজন শুক্রবার রাতে এবং অন্যজন শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন বলে জানা গেছে। 

মার্কিন কর্মকর্তারা বিষয়টিকে সরাসরি বহিষ্কার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, জাতিসংঘের অধিবেশন শেষ হওয়ার অনেক পরও ওই দুই সদস্য নিউইয়র্কে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, রুবিও বিষয়টিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। 

তবে ইরানের পক্ষ থেকে বিষয়টির ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তেহরানের প্রতিনিধিরা আগেই জানিয়েছিলেন, ইরানি প্রতিনিধিদলের নিউইয়র্ক ছাড়ার সময়সূচি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে ১৭ সেপ্টেম্বর জানানো হয়েছিল। ইরানের দাবি ছিল, তাদের প্রতিনিধিদল নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারেই নিউইয়র্ক ছেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়নি। 

এখানেই ঘটনার তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যে বলা হচ্ছে, মার্কো রুবিও দুই ইরানি প্রতিনিধিকে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তারা তা অমান্য করার পর বহিষ্কৃত হয়েছেন। বিষয়টির মূল অংশ সত্য হলেও সময়ক্রমটি কিছুটা ভিন্ন। রুবিও প্রথমে ইরানের বৃহত্তর প্রতিনিধিদলকে নিউইয়র্ক ছাড়ার নির্দেশ দেন। পরে দেখা যায়, দুই সদস্য তখনও যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। এরপর তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থাৎ দুই সদস্যকে একই মুহূর্তে প্রথম নির্দেশের পরপরই বের করে দেওয়া হয়নি; বরং আগের নির্দেশ অমান্য করার পর তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

ঘটনার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। আলোচনায় কাতার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল। প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালির অবস্থা, চলমান সংঘাতের অবসান এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা। কিন্তু এসব আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে হতাশা বাড়ে। 

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, রুবিও মনে করেছিলেন জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়ে যাওয়ার পর ইরানি প্রতিনিধিদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার আর প্রয়োজন নেই। এ কারণেই তাঁদের দ্রুত নিউইয়র্ক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করছে। 

এই ঘটনার তাৎপর্য শুধু দুই কূটনীতিককে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে এমন ঘটনা ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের গভীর অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে যখন সংঘাত নিরসনের আলোচনা চলছিল, তখন প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বহিষ্কারের ঘটনা ভবিষ্যৎ আলোচনার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

তবে একই সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্যও এখনো নেই। কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইরানি প্রতিনিধিদের বহিষ্কারকে একদিকে কঠোর মার্কিন কূটনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ হিসেবে দেখা হলেও, অন্যদিকে এটি চলমান আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর