রিয়াদে আরামকো স্থাপনায় আগুন, হামলার দাবি হুতিদের—সৌদির নীরবতা

রিয়াদের আরামকো তেল স্থাপনায় আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে, হামলার দায় স্বীকার করেছে হুতিরা, তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত করেনি।

রিয়াদে আরামকো স্থাপনায় আগুন, হামলার দাবি হুতিদের—সৌদির নীরবতা

রিয়াদে আরামকো স্থাপনায় আগুন, হামলার দাবি হুতিদের—সৌদির নীরবতা


সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি তেল স্থাপনায় শনিবার আগুন ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার পর ওই স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান দিয়ে হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। তবে হামলার দাবি এখনো স্বাধীনভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও তাৎক্ষণিকভাবে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ফলে ঘটনাটিকে আপাতত হুতিদের দাবি এবং স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ড এই দুইটি পৃথকভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার রিয়াদের একটি আরামকো স্থাপনার আশপাশে আগুন ও ঘন ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলের একজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। একই সময়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি আগুন নেভানোর তৎপরতা দেখা গেছে। রয়টার্সের প্রকাশিত ছবিতেও রিয়াদের দক্ষিণে আরামকোর একটি তেল শোধনাগার থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। ছবিটির তারিখ ৩ অক্টোবর ২০২৬। 

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি পরে দাবি করেন, সৌদি রাজধানীর আরামকো স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও অন্যান্য এলাকায় সৌদি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে। হুতিদের দাবি, হামলার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে এবং লক্ষ্যবস্তু এলাকায় আগুনও সৃষ্টি হয়েছে। 

তবে সৌদি পক্ষ থেকে ঘটনাটির ব্যাখ্যা ভিন্ন। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি হুতিদের রিয়াদে হামলার দাবি বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হুতিরা নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি ও তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি হওয়া জনঅসন্তোষ থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, হামলা হয়েছে কি না এবং আগুনের কারণ কী—এ বিষয়ে সৌদি পক্ষের বক্তব্য এখনো হুতিদের দাবির সঙ্গে মেলেনি। 

আরামকোও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও আগুনের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিংবা সম্ভাব্য হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো নির্ভরযোগ্য ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই স্থাপনাটিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বা চালকবিহীন বিমানের আঘাত লেগেছে কি না, কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। 

তথ্য যাচাইয়ের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগুন ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার ঘটনা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিশ্চিত হয়েছে। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীও স্থাপনার কাছে আগুন ও ধোঁয়া দেখেছেন। এ ছাড়া ফরাসি বার্তা সংস্থার একজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে অগ্নিনির্বাপক গাড়িকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে দেখেছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। তবে আগুনের সঙ্গে হুতিদের হামলার সরাসরি সম্পর্ক এখনো সৌদি কর্তৃপক্ষ বা স্বাধীন কোনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। 

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। গত সপ্তাহেও হুতিরা ইয়ানবু এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান দিয়ে হামলার দাবি করেছিল। সৌদি আরব তখন জানিয়েছিল, তাইফ ও ইয়ানবু এলাকার দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় আরামকোর স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়নি। 

সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে ইয়েমেনের যুদ্ধের নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও অন্যান্য এলাকায় সৌদি হামলার অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে সৌদি আরব হুতিদের সামরিক তৎপরতা এবং সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক হিসেবে সৌদি আরবের বড় কোনো তেল স্থাপনায় হামলা হলে তা শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ নয়, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে সৌদি তেল স্থাপনায় বড় ধরনের হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

তবে এবারের ঘটনায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের উৎপাদন বন্ধ, রপ্তানি ব্যাহত হওয়া কিংবা জ্বালানি সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটিকে বড় আকারের তেল সরবরাহ সংকট হিসেবে উপস্থাপন করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণও এখনো নেই।

সামগ্রিকভাবে তথ্য যাচাইয়ের ফল বলছে, রিয়াদের আরামকো স্থাপনার কাছে আগুন ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার ঘটনা সত্য এবং হুতিরা হামলার দায় দাবি করেছে। কিন্তু আগুনটি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র বা চালকবিহীন বিমান হামলার ফল এই অংশটি এখনো নিশ্চিত নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ ও আরামকোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত কারণ, ক্ষয়ক্ষতি এবং হামলার ধরন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর