হরমুজে মার্কিন অবরোধ অটুট, ইরানকে ট্রাম্পের কঠোর বার্তা, নতুন করে যুদ্ধের উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ অটুট রাখার ঘোষণা দিয়ে ইরানকে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন, বাড়ছে সংঘাত ও বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ।
হরমুজে মার্কিন অবরোধ অটুট, ইরানকে ট্রাম্পের কঠোর বার্তা, নতুন করে যুদ্ধের উদ্বেগ
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এখনো সম্পূর্ণ কার্যকর রয়েছে। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ে ‘খেলতে’ থাকলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে তারা বর্তমানে শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং ইরানকে পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
হেগসেথের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রয়েছে এমন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রই সেখানে নৌ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি দাবি করেন, মার্কিন অবরোধ এতটাই কঠোর যে ইরান থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পণ্য বা তেল সরবরাহ বের হতে পারছে না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালিটি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের পরিমাণ যুদ্ধের আগের সময়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তবে এই দাবির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। বিভিন্ন স্বাধীন জ্বালানি ও নৌ চলাচল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে, কিন্তু পুরো নৌ চলাচল এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। সেপ্টেম্বর মাসে প্রণালিটি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের পরিমাণ যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। একই সময়ে তেল পরিবহনও উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হয়েছে।
অর্থাৎ হেগসেথের বক্তব্যের মূল অংশটি সত্য যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ বজায় রাখছে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর এর বড় প্রভাব পড়েছে। তবে ‘হরমুজ পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে’ এটি মার্কিন সরকারের অবস্থান, সর্বসম্মত স্বাধীন মূল্যায়ন নয়। সাম্প্রতিক সময়েও বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার মুখে পড়েছে এবং নৌ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। পারস্য উপসাগর থেকে এ পথ দিয়েই সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিশ্ববাজারে পৌঁছে। ফলে এই জলপথে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি। ইরাকের একটি বড় তেলবাহী জাহাজ সম্প্রতি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ঘটনাটি দেখাচ্ছে যে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর তৎপরতা পরিস্থিতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজের কাছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজগুলো সক্রিয় রয়েছে। একই সময়ে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলার ঝুঁকিও অব্যাহত রয়েছে।
হেগসেথ আরও বলেন, ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না। তার ভাষায়, ইরান যদি মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে, তাহলে ট্রাম্পের সামনে প্রয়োজনীয় সব বিকল্প খোলা থাকবে। তিনি অবশ্য নির্দিষ্ট করে বলেননি, সেই বিকল্পগুলোর মধ্যে নতুন সামরিক অভিযান, আরও অবরোধ, নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থা থাকবে।
এর আগে হেগসেথ জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ এলাকায় নৌ অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। মার্কিন নৌবাহিনী পালাক্রমে জাহাজ ও জনবল ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ধরে রাখতে পারবে বলেও তিনি দাবি করেছিলেন।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। তেহরান হরমুজকে নিজেদের কৌশলগত প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে একই জলপথ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বিপরীতমুখী অবস্থান সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবহন হতো। সংঘাতের পর বিকল্প পাইপলাইন, জাহাজ বদল এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলো রপ্তানি সচল রাখার চেষ্টা করেছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ অনেকটাই পুনরুদ্ধার হলেও পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহ এখনো বড় চাপের মধ্যে রয়েছে।
সব মিলিয়ে হেগসেথের সর্বশেষ বক্তব্যকে সরাসরি নতুন সামরিক অভিযানের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইরানের ওপর কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রাখার একটি কঠোর বার্তা। তবে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দুই পক্ষের চাপ ও পাল্টা চাপ শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথে যায়, নাকি নতুন সামরিক সংঘাতের দিকে পরিস্থিতি এগিয়ে নেয়।