কর্নেল ধর্ষণকাণ্ডে গোপন করার অভিযোগ, নতুন তদন্তে বেরোচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে নতুন তদন্ত শুরু, আইনজীবীর গোপন করার অভিযোগ ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন ও চাপ।

কর্নেল ধর্ষণকাণ্ডে গোপন করার অভিযোগ, নতুন তদন্তে বেরোচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

কর্নেল ধর্ষণকাণ্ডে গোপন করার অভিযোগ, নতুন তদন্তে বেরোচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য


কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ২০২৪ সালের কথিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আদালতে দায়ের করা দেওয়ানি মামলায় ‘জেন ডো’ নামে পরিচিত এক সাবেক ছাত্রী অভিযোগ করেছেন, ২০২৪ সালের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চি ফাই ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে তাকে মাদক ও মদ্যপান করিয়ে একাধিক ব্যক্তি যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ করেন। মামলায় সাতজন পুরুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়নি এবং অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিতও হয়নি। 

অভিযোগকারী ওই সময় কর্নেলের ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ছিলেন। তার দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, ওই রাতে তিনি প্রচুর পরিমাণে মদ্যপানের পর ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে যান। সেখানে তাকে আরও মদ, গাঁজা ও কেটামিন নামে একটি মাদক গ্রহণে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এরপর তিনি এমন অবস্থায় পৌঁছান যে নিজের সম্মতি দেওয়ার মতো সক্ষমতা তার ছিল না—এমনটাই মামলায় দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরে আরও কয়েকজন সেখানে আসে এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে যৌন নির্যাতন চালানো হয়। 

মামলায় আরও দাবি করা হয়েছে, ভ্রাতৃসংঘের সদস্যদের একটি বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থায় এমন বার্তা পাঠানো হয়েছিল, যা অন্য সদস্যদের ওই কক্ষে এসে যৌন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার আহ্বান হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই বার্তাটিই পরবর্তী সময়ে তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। অন্তত একজন অভিযুক্তের আইনজীবী বলেছেন, তার মক্কেল কোনো যৌন নিপীড়নে অংশ নেননি। 

ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর জেন ডো বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিলিপি থেকে জানা যায়, তিনি তদন্তকারীদের কাছে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় জেলা কৌঁসুলি ম্যাথিউ ভ্যান হাউটেন পরে জানান, ওই সাক্ষাৎকারের পূর্ণ প্রতিলিপি তিনি দেখেননি। তার কাছে যে লিখিত বিবৃতি পৌঁছেছিল, সেখানে ঘটনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না বলে তিনি দাবি করেন। 

এখানেই মামলাটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জেন ডোর আইনজীবী থমাস জিউফ্রা দাবি করছেন, তদন্তকারীদের কাছে মামলা এগিয়ে নেওয়ার মতো প্রমাণ ছিল। তার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যথাযথভাবে অনুসন্ধান না করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি এই ব্যবস্থাপনাকে ‘গোপন করার প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এটি এখনো আইনজীবীর অভিযোগ—স্বাধীন তদন্তে এমন কোনো গোপন করার ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হয়েছে বলে বলা যাচ্ছে না। 

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় জেলা কৌঁসুলি শুরুতে অভিযোগে ফৌজদারি মামলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পাওয়া শপথযুক্ত লিখিত বিবৃতিতে জেন ডোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যে মাদক গ্রহণ ও যৌন কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ স্বেচ্ছামূলক ছিল। তিনি আরও বলেন, তখনকার তথ্যের ভিত্তিতে নিউইয়র্কের প্রচলিত আইনে অপরাধ প্রমাণ করে অভিযোগ আনা কঠিন ছিল। 

তবে পরে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের তথ্য, দেওয়ানি মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ এবং বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় কৌঁসুলি ২৮ সেপ্টেম্বর তদন্ত পুনরায় খোলার ঘোষণা দেন এবং জানান, বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। 

এরপর পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নেয়। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল ১ অক্টোবর অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের দপ্তরকে বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ করেন। গভর্নর বলেন, নতুন প্রকাশিত তথ্য কর্নেল পুলিশের তদন্ত এবং স্থানীয় কৌঁসুলির সিদ্ধান্ত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং স্থানীয় কৌঁসুলির ওপর তার ও সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগের ফলে তদন্ত এখন আরও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। লেটিশিয়া জেমসের দপ্তর জানিয়েছে, অভিযোগটি তথ্য ও আইনের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি বৃহৎ বিচারকমণ্ডলীর সামনে উপস্থাপন করা হতে পারে। 

অন্যদিকে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় অভিযোগিত ঘটনাকে গুরুতর বলে জানিয়েছে এবং নতুন ফৌজদারি তদন্তকে সমর্থন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, ২০২৪ সালে তারা আলাদাভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালিয়েছিল। ওই প্রক্রিয়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার ও সাময়িক বরখাস্তসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। চি ফাইয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাটিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। 

বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য আইনজীবীর ‘গোপন করার’ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কর্নেলের প্রেসিডেন্ট মাইকেল কোটলিকফ বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন পর্যালোচনার জন্য বাইরের আইনজীবী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। 

মামলাটি নিউইয়র্কের যৌন নিপীড়ন আইনের সীমাবদ্ধতা নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে কেউ স্বেচ্ছায় মদ বা মাদক গ্রহণ করার পর অচেতন বা অক্ষম হয়ে পড়লে সেই অবস্থায় যৌন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ফৌজদারি দায় নির্ধারণ কতটা সহজ এ নিয়ে আইন পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। গভর্নর হোকুলও এ বিষয়ে আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্ত এখনো চলমান। তাই জেন ডোর অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে কিংবা অভিযুক্তদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বা পুলিশের বিরুদ্ধে ‘গোপন করার’ অভিযোগও এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। বিশেষ কৌঁসুলি লেটিশিয়া জেমসের নেতৃত্বে নতুন তদন্তে শেষ পর্যন্ত কী প্রমাণ পাওয়া যায় এবং অভিযোগ ফৌজদারি মামলায় রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর