ঘড়ির কাঁটা বদল বন্ধ চান ট্রাম্প, বাধা টম কটন, বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
স্থায়ীভাবে গ্রীষ্মকালীন সময় চালুর আইনপ্রস্তাব আটকে থাকায় ট্রাম্প সিনেটর টম কটনের ওপর চাপ বাড়িয়ে ফোন নম্বর প্রকাশ করেছেন, বিতর্ক তীব্র
যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে বা পিছিয়ে দেওয়ার দীর্ঘদিনের নিয়ম বন্ধ করা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান সিনেটর টম কটনের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। শনিবার ৩ অক্টোবর ট্রাম্প একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় কটনের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করেন এবং সাধারণ মানুষকে কটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনপ্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। একইসঙ্গে ট্রাম্প এমন একটি ফোন নম্বর প্রকাশ করেন, যেটিকে তিনি কটনের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নম্বরটির মালিকানা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গ্রীষ্মকালীন সময় সারা বছর চালু রাখার আইনপ্রস্তাব। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ এলাকায় বসন্তে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয় এবং শরতে আবার এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়। নতুন আইনপ্রস্তাবটি এই বছরে দুবার সময় পরিবর্তনের নিয়ম বন্ধ করে সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু রাখার লক্ষ্য নিয়েছে।
এই আইনপ্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে ইতোমধ্যে বড় ব্যবধানে পাস হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রতিনিধি পরিষদে ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি ৩০৮-১১৭ ভোটে অনুমোদিত হয়। এর পক্ষে ১৯৩ জন রিপাবলিকান, ১১৪ জন ডেমোক্র্যাট এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য ভোট দেন। ফলে এটিকে শুধু একটি দলের উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি উচ্চকক্ষে গিয়ে আটকে আছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৫ জুলাই প্রস্তাবটি উচ্চকক্ষে পাঠানো হয় এবং বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও পরিবহনসংক্রান্ত কমিটিতে পাঠানো হয়। অর্থাৎ এটি এখনো চূড়ান্তভাবে আইন হয়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা বদলাতে বিরক্ত। তাঁর মতে, সকালের তুলনায় দিনের শেষ ভাগে অতিরিক্ত আলো পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বেশি সুবিধাজনক। তিনি বিশেষ করে খেলাধুলা, কৃষিকাজ, বিনোদন এবং সন্ধ্যার সময় বাইরে থাকা মানুষের সুবিধার কথা তুলে ধরেছেন। শনিবারের এক বার্তায় তিনি পেশাদার গলফ প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিকেলে বেশি আলো থাকলে প্রতিযোগিতা শেষ করার জন্য আরও সময় পাওয়া যাবে।
এরপর ট্রাম্প আরও কঠোর ভাষায় কটনকে আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, কটন তাঁর পরিচিত ব্যক্তি হলেও কেন আইনপ্রস্তাবটি আটকে রাখছেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ট্রাম্পের দাবি, উচ্চকক্ষে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার জন্য খুব বেশি কিছু প্রয়োজন নেই এবং তিনি আশা করছেন এটি দুই দলের সমর্থনেই পাস হবে। তিনি আরকানসাসের জনগণকে কটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানান।
এরপর আরও একটি বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ঘড়ির কাঁটা বারবার বদলানোর ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং বিকেলে অতিরিক্ত আলো পাওয়া আরকানসাসের মানুষের জন্যও উপকারী হবে। তিনি কটনকে রাজনৈতিকভাবে এই আইনপ্রস্তাব পাস করিয়ে নেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানান।
ট্রাম্পের প্রকাশিত ফোন নম্বরের বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নম্বরটি কটনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনের বলে ট্রাম্প দাবি করেছেন। তবে নম্বরটি সত্যিই কটনের ব্যক্তিগত নম্বর কি না, তা সব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। একটি সংবাদমাধ্যম নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও উত্তর পাওয়া যায়নি এবং অন্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্তা পাঠানো সম্ভব হয়নি। তাই নম্বরটির সত্যতা নিশ্চিত না করে সেটিকে কটনের নিশ্চিত ব্যক্তিগত নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক হবে না।
কটন অবশ্য ট্রাম্পের চাপের কাছে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেননি। তিনি বলেন, তিনিও বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন পছন্দ করেন না। কিন্তু তাঁর আপত্তি হলো সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু রাখলে শীতের সকালে অনেক জায়গায় সূর্য উঠবে অনেক দেরিতে। তাঁর যুক্তি, এতে শিশুদের অন্ধকারের মধ্যে বিদ্যালয়ে যেতে হতে পারে এবং ভোরে কাজে বের হওয়া মানুষের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কটনের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, আরকানসাসের কিছু এলাকায় শীতের সবচেয়ে ছোট দিনগুলোতে সকাল আটটা বা সাড়ে আটটার আগে সূর্য উঠবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আরও উত্তরের ও সময় অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও চরম হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় শীতকালে সূর্যোদয় সকাল নয়টার কাছাকাছি বা তারও পরে হতে পারে।
কটনের বিরোধিতার পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ নেই। তিনি ১৯৭০-এর দশকের একটি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু করা হয়েছিল। তখন শীতের সকালে অন্ধকারে মানুষকে কাজে ও বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই এই ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে এবং পরে তা বাতিল করা হয়। কটনের যুক্তি হলো, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ধরনের সিদ্ধান্ত আবার নেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে এই আইনপ্রস্তাবের সমর্থকেরা বলছেন, বছরে দুবার সময় পরিবর্তনের কারণে মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে। সময় পরিবর্তনের পর ক্লান্তি, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে বলেও সমর্থকেরা যুক্তি দেন। বিকেলে অতিরিক্ত আলো থাকলে ব্যবসা, পর্যটন, খেলাধুলা এবং বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁদের দাবি।
তবে চিকিৎসা ও ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ স্থায়ী গ্রীষ্মকালীন সময়ের পরিবর্তে সারা বছর স্বাভাবিক সময় রাখার পক্ষে। তাঁদের যুক্তি, মানুষের শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের ছন্দ সকালের প্রাকৃতিক আলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে শীতকালে সূর্যোদয় আরও পিছিয়ে গেলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিনিধি পরিষদে আইনপ্রস্তাব পাস হয়ে গেলেও তা কার্যকর হওয়ার জন্য উচ্চকক্ষের অনুমোদন এবং পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন। সরকারি নথিতেই দেখা যাচ্ছে, প্রস্তাবটি এখনো উচ্চকক্ষের সংশ্লিষ্ট কমিটির পর্যায়ে রয়েছে। তাই এটি এখনই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সময় পরিবর্তনের নিয়ম বাতিল করে দিচ্ছে—এমন দাবি সঠিক নয়।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কংগ্রেসের সময়সূচির কারণে। উচ্চকক্ষ অক্টোবরের নিয়মিত আইন প্রণয়ন কার্যক্রম থেকে বিরত রয়েছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই বিষয়ে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা কম। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে উচ্চকক্ষে আইনপ্রস্তাবটি নিয়ে অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
এখানেই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চাপের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তিনি শুধু আইনপ্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থানই নিচ্ছেন না, বরং নিজের দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সিনেটরের বিরোধিতাকেও প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করছেন। তবে আইনপ্রস্তাবটি শুধু টম কটনের কারণে আটকে আছে—এমন দাবি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়। কটন অন্যতম প্রকাশ্য বিরোধী হলেও উচ্চকক্ষে আরও কয়েকজন রিপাবলিকান এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন। সিনেটর জন কেনেডিও এই উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
জনমতও বিষয়টিকে সহজ করে দিচ্ছে না। ২০২৫ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষ বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের বর্তমান ব্যবস্থা পছন্দ করেন না। কিন্তু মানুষ ঘড়ির কাঁটা আর পরিবর্তন করতে না চাইলেও সবাই যে সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময়ই চান, বিষয়টি এমন নয়। কেউ সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চান, আবার কেউ সারা বছর স্বাভাবিক সময় রাখার পক্ষে।




