উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টায় অভিযুক্ত ওমানি সহকারী পাইলটের উগ্রপন্থী অতীত নিয়ে তথ্য সামনে
দুবাই থেকে তেলআবিবগামী বিমানে অভিযুক্ত সহকারী পাইলটের হামলায় ক্যাপ্টেন আহত হন, যাত্রীদের সহায়তায় বিমান সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করে নিরাপদে।
উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টায় অভিযুক্ত ওমানি সহকারী পাইলটের উগ্রপন্থী অতীত নিয়ে তথ্য সামনে
দুবাই থেকে তেলআবিব যাওয়ার পথে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে সহকারী পাইলটের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেনকে হামলা এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অভিযুক্ত সহকারী পাইলটের নাম হামাম আল-হামামি। তিনি ওমানের নাগরিক। তবে তাঁর পরিচয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আগের অভিযোগগুলো এখনো সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
ঘটনাটি ঘটে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ নম্বর উড়োজাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেলআবিবের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। উড়োজাহাজের গতিপথ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অল্প সময়ের মধ্যে এটি প্রায় ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। এরপর আবার ওপরে ওঠে এবং দ্বিতীয়বারও দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে।
এই সময় উড়োজাহাজের ককপিটে ক্যাপ্টেন ও সহকারী পাইলটের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌঁসুলির কার্যালয় পরে জানায়, সহকারী পাইলট ককপিটে থাকা জরুরি ব্যবহারের কুঠার দিয়ে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করেন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছে। তবে হামলার পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনো তদন্তাধীন।
হামলায় ক্যাপ্টেন গুরুতর আহত হলেও তিনি ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর কয়েকজন যাত্রী দ্রুত ককপিটে প্রবেশ করে অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করেন। উড়োজাহাজে থাকা আরও দুই প্রশিক্ষিত পাইলটও পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন। তাদের সহায়তায় উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল করা হয়। পরে উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুক শহরের একটি বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
উড়োজাহাজের গতিপথ ও জরুরি সংকেতের তথ্যও ঘটনাটির ভয়াবহতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছে। উড়োজাহাজটি প্রথমে সাধারণ জরুরি সংকেত পাঠায়। পরে কিছু সময়ের জন্য এমন একটি সংকেত ব্যবহার করা হয়, যা উড়োজাহাজে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিস্থিতি বোঝাতে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। এরপর আবার সাধারণ জরুরি সংকেত দেওয়া হয়। সৌদি আরবের তাবুকে অবতরণের আগ পর্যন্ত উড়োজাহাজটির গতিপথ অস্বাভাবিক ছিল।
ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে অভিযুক্ত সহকারী পাইলট হামাম আল-হামামির পূর্ববর্তী কর্মজীবন। রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আল জাজিরা এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমানে একটি বিমান সংস্থায় কাজ করার সময় তাঁর মতাদর্শ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমান কর্তৃপক্ষ তাঁকে দেশটিতে উড়োজাহাজ চালানো থেকে বিরত রেখেছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ওমানের একটি বিমান সংস্থায় সহকারী পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় তাঁর কাছে উগ্রপন্থী মতাদর্শের কিছু উপকরণ পাওয়া গিয়েছিল বলে গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর তাঁকে এক বছরের জন্য উড়োজাহাজ চালানো থেকে বিরত রাখা হলেও প্রশাসনিক কাজে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব তথ্য এখনো ওমানের সরকার প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি।
আরও কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমানে উড়োজাহাজ চালানো থেকে বিরত রাখার পর তিনি পরবর্তী সময়ে অন্য বিমান সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরে ফ্লাইদুবাইয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন সময় ওমান, মরক্কো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে তাঁর চাকরির ধারাবাহিকতা এবং কোন পর্যায়ে কোন কর্তৃপক্ষ তাঁর অতীত সম্পর্কে অবগত ছিল, সেটি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এখানেই এই ঘটনার অন্যতম বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদি সত্যিই তাঁর বিরুদ্ধে আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে উড়োজাহাজ চালানোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে তিনি কীভাবে আবার বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চালানোর অনুমতি পেলেন এবং অন্য একটি দেশের বিমান সংস্থায় পাইলট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আগের সতর্কতার তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে আদানপ্রদান হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। হামাম আল-হামামির পরিচয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে একাধিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত হলেও ওমানি কর্তৃপক্ষ এখনো তাঁর পরিচয় বা কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শ সম্পর্কে প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ নিশ্চিতকরণ দেয়নি। আল জাজিরাও জানিয়েছে, তাঁর পরিচয় এবং তাঁর বিশ্বাস সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। ফলে এসব তথ্যকে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে নয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও অভিযুক্ত সহকারী পাইলটের কথিত উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, হামামি উগ্র ইসলামপন্থী প্রভাবের মধ্যে ছিলেন। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়নি। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এই দাবিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্তকারীরা আরও খতিয়ে দেখছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি একাই এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না, নাকি তাঁর সঙ্গে অন্য কারও যোগাযোগ ছিল। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র সংগঠন বা বিদেশি সরকারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এ ধরনের যোগসূত্রের পক্ষে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিমানের যাত্রীদের ভূমিকা। ক্যাপ্টেন আহত হওয়ার পর ককপিটের দরজা খোলার সুযোগ তৈরি হলে কয়েকজন যাত্রী ভেতরে ঢুকে অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। একজন যাত্রী উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। পরে উড়োজাহাজে থাকা অন্য দুই পাইলট নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তাদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে উড়োজাহাজটি নিরাপদে তাবুকে নামানো সম্ভব হয়।
সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবতরণের পর ক্যাপ্টেন ও সহকারী পাইলটকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। পরে দুজনকেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়ে যাওয়া হয়। তদন্তের দায়িত্ব মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে এবং সৌদি আরব ও ইসরায়েলসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তারাও তদন্তে যুক্ত রয়েছেন।
ঘটনার পর ফ্লাইদুবাই তেলআবিবগামী এবং তেলআবিব থেকে আসা তাদের উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা কাজ করবে। একই সঙ্গে যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে পাইলট নিয়োগ ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কোনো পাইলটের বিরুদ্ধে অতীতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে সেই তথ্য অন্য দেশ ও বিমান সংস্থার কাছে কীভাবে পৌঁছায়, সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ থাকলেই তিনি পরবর্তী সময়ে অপরাধ করবেন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বর্তমান ঘটনায় অভিযোগ, অতীতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য এবং হামলার উদ্দেশ্য সবগুলো বিষয় আলাদা করে যাচাই করা হচ্ছে।