গাজায় তিন বছর পর ফিরল চার বোনের শেষ চিহ্ন, বাবার হাতে তুলে দেওয়া হলো দেহাবশেষ

গাজার আল-তাজ এলাকায় ২০২৩ সালের হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল বহু মানুষের দেহাবশেষ। প্রায় তিন বছর পর সেখান থেকে উদ্ধার হলো ফাদি দাউদের চার মেয়ের দেহাবশেষ।

গাজায় তিন বছর পর ফিরল চার বোনের শেষ চিহ্ন, বাবার হাতে তুলে দেওয়া হলো দেহাবশেষ

গাজায় তিন বছর পর ফিরল চার বোনের শেষ চিহ্ন, বাবার হাতে তুলে দেওয়া হলো দেহাবশেষ


গাজা সিটির আল-ইয়ারমুক এলাকায় প্রায় তিন বছর আগে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি আবাসিক কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে ফাদি দাউদ পরিবারের হৃদয়বিদারক কাহিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজের চার মেয়ের দেহাবশেষ ফিরে পেয়েছেন এই বাবা। নিহত চার বোনের নাম লানা, হালা, সামা ও জৌরি দাউদ। তাদের মা আসমাও ওই হামলায় নিহত হন বলে নথিভুক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর। সেদিন গাজা সিটির আল-ইয়ারমুক এলাকার আল-তাজ আবাসিক কমপ্লেক্স ও আশপাশের ভবনগুলোতে ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। হামলায় সাততলা আল-তাজ-৩ ভবনসহ বেশ কয়েকটি আবাসিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। সেখানে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নেওয়া পরিবারও অবস্থান করছিল। হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকা পড়ে।

সেই সময় উদ্ধারকারী দলগুলোর পক্ষে ধ্বংসস্তূপের গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ভারী যন্ত্রপাতির ঘাটতি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে বহু মরদেহ সেখানেই চাপা পড়ে থাকে। ফলে নিহতদের স্বজনদের অনেককেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রিয়জনদের দেহাবশেষ উদ্ধারের জন্য। ফাদি দাউদের পরিবারও ছিল সেই অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর একটি।

ফাদি দাউদের চার মেয়ের মধ্যে জৌরি ও তাদের মা আসমার দেহাবশেষ আগেই উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু লানা, হালা ও সামার দেহাবশেষ ধ্বংসস্তূপের নিচেই থেকে যায়। পরে আল-তাজ এলাকার ধ্বংসস্তূপে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হলে উদ্ধারকারীরা তিন মেয়ের দেহাবশেষও খুঁজে পান। তাদের নাম ও দেহাবশেষ উদ্ধারের তথ্য নথিভুক্ত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে আল-তাজ এলাকায় সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানটি প্রায় ১৭ দিন ধরে পরিচালিত হয়। গাজার সিভিল ডিফেন্সের দলগুলো মিশরীয় সহায়তার সঙ্গে সমন্বয় করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজ চালায়। অভিযানে আল-তাজ এলাকার ১৬টি আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১০৫ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে বলে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের মধ্যে ৩৭ শিশু ও ৩৮ নারী ছিলেন।

উদ্ধার করা দেহাবশেষগুলো ১ অক্টোবর গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার শহীদ কবরস্থানে দাফন করা হয়। শেষ বিদায়ে অংশ নেন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘ সময় পর স্বজনদের দেহাবশেষ হাতে পাওয়ার মুহূর্তটি একদিকে যেমন পরিবারের জন্য অপেক্ষার অবসান, অন্যদিকে তেমনি কয়েক বছর ধরে জমে থাকা শোককে আবারও সামনে নিয়ে আসে।

আল-তাজ এলাকার এই ঘটনা গাজার যুদ্ধের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক দিক তুলে ধরেছে। একটি হামলার পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মরদেহ উদ্ধারের কাজ কয়েক বছর পরও শেষ হয়নি। গাজার সিভিল ডিফেন্সের হিসাব অনুযায়ী, উপত্যকার বিভিন্ন ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের নিচে এখনো ৮ হাজারের বেশি মানুষের দেহাবশেষ আটকে থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির সংকট থাকায় এসব দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে আছে।

ফাদি দাউদের চার মেয়ের দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনাটি তাই শুধু একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার সমাপ্তি নয়; এটি গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো নিখোঁজ হয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের স্বজনদের অনিশ্চয়তার কথাও সামনে এনেছে। প্রায় তিন বছর পর অন্তত নিজের সন্তানদের কবর দেওয়ার সুযোগ পেলেন এক বাবা—যে অপেক্ষার শেষটা এসেছে দেরিতে, কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে আরও গভীর এক শোকের স্মৃতি।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর