নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনপন্থী বলেই ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীর নতুন নির্বাচনী প্রচারণা
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে ডানপন্থী নেতা আভিগদোর লিবারম্যান নেতানিয়াহুর পুরোনো বক্তব্য তুলে ধরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সমর্থনের অভিযোগ তুলেছেন।
নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনপন্থী বলেই ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীর নতুন নির্বাচনী প্রচারণা
ইসরায়েলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ডানপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের ভেতরেই প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। দেশটির ডানপন্থী বিরোধী দল ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদোর লিবারম্যান এবার নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকার অভিযোগ তুলেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহুর বহু বছর আগের বক্তব্য ব্যবহার করে তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে, যিনি অতীতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা মেনে নিয়েছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। লিবারম্যান পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় জর্ডানকে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাগত দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কার্যকরভাবে ওই অঞ্চল পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সেখানে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হলে হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী তা কাজে লাগাতে পারে। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের এ এবং বি এলাকায় জর্ডান প্রশাসনিক ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারে।
লিবারম্যানের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর নেতানিয়াহু তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লিবারম্যানকে বামপন্থী হিসেবে আক্রমণ করেন এবং অভিযোগ করেন, লিবারম্যান ভবিষ্যতে গাদি আইজেনকট, নাফতালি বেনেট, ইয়ার গোলান ও আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠন করতে পারেন। নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইসরায়েলের ভূখণ্ডের কোনো অংশে জর্ডানের সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়।
এর জবাবেই লিবারম্যান নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অতীত সামনে আনেন। তিনি দাবি করেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করা ইসরায়েলি রাজনীতিকদের মধ্যে নেতানিয়াহুই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বিশেষ করে তিনি ২০০৯ সালে বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া নেতানিয়াহুর ভাষণের দিকে ইঙ্গিত করেন। ওই ভাষণে নেতানিয়াহু নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে একটি অসামরিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণা গ্রহণ করেছিলেন।
ইসরায়েল সরকারের নিজস্ব নথিতেও বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০০৯ সালের জুনে নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে ইহুদি জনগণের জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলের পাশে এমন একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণা তিনি গ্রহণ করতে পারেন, যার সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না। অর্থাৎ লিবারম্যানের অভিযোগের পেছনে বাস্তব ঐতিহাসিক বক্তব্য রয়েছে।
তবে এখানেই বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে। নেতানিয়াহুর ২০০৯ সালের অবস্থানকে সরাসরি বর্তমান অর্থে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তিনি তখন একটি অসামরিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি এবং কঠোর নিরাপত্তা শর্তকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে।
লিবারম্যান অবশ্য শুধু পুরোনো বক্তব্য উল্লেখ করেই থামেননি। তিনি নেতানিয়াহুর অতীত মন্তব্য নিয়ে একটি প্রচারমূলক ভিডিও প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন, ভিডিওতে ব্যবহৃত বক্তব্যগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি নয়, বরং নেতানিয়াহুর নিজের পুরোনো বক্তব্য। এর মাধ্যমে তিনি বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহুর অতীত অবস্থানকে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।
ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ লিবারম্যান নিজেও ইসরায়েলের রাজনীতিতে কঠোর নিরাপত্তাপন্থী ও ডানঘেঁষা নেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর সাম্প্রতিক জর্ডান-সংক্রান্ত প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও ইসরায়েলি সরকারের কট্টর ডানপন্থী নেতারা তীব্র সমালোচনা করেছেন। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ অভিযোগ করেন, লিবারম্যানের পরিকল্পনা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করবে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও তাঁকে ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক বলে আক্রমণ করেছেন।
ফলে নির্বাচনী লড়াইয়ে একটি অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাধারণত নেতানিয়াহু তাঁর বিরোধীদের বামপন্থী বা ফিলিস্তিনিদের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় হিসেবে আক্রমণ করে থাকেন। এবার তাঁরই ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁকে একই ধরনের অভিযোগে আক্রমণ করছেন। এতে বোঝা যায়, ইসরায়েলের ডানপন্থী ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার লড়াই কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে।
আসন্ন নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রচারণাও নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রচারণায় তিনি বিরোধীদের বামপন্থী এবং আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। একই সময়ে বিরোধীরা তাঁর দীর্ঘ শাসনকাল, নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং ২০২৩ সালের হামলার পর সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে কোনো পক্ষই সহজে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত। ফলে ডানপন্থী শিবিরের ভেতরের ভোটের বিভাজনও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
“লিবারম্যান নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনপন্থী বলেছেন” এই মূল দাবিটি সত্য। লিবারম্যান সত্যিই নেতানিয়াহুর ২০০৯ সালের বক্তব্য ব্যবহার করে এমন রাজনৈতিক আক্রমণ চালিয়েছেন। কিন্তু “নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনপন্থী” এটিকে প্রতিষ্ঠিত নিরপেক্ষ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, লিবারম্যান নেতানিয়াহুর অতীতের শর্তসাপেক্ষ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সমর্থনকে বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন।